প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মায়ানমারের সীমান্তবর্তী কৌশলগত ও বিরল খনিজ সমৃদ্ধ অঞ্চল পুনর্দখলের লক্ষ্যে দেশটির সেনাবাহিনী নতুন করে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়তে থাকায় এই অভিযানকে দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধের একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক বাহিনী মূলত চীন, ভারত ও থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী তিনটি কৌশলগত অঞ্চলে অভিযান জোরদার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চীনের সীমান্তসংলগ্ন কাচিন রাজ্য, ভারতের সীমান্তবর্তী চিন রাজ্য এবং থাইল্যান্ড ঘেঁষা কারেন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ।
এই অঞ্চলগুলো শুধু ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত কৌশলগত। বিশেষ করে কাচিন রাজ্যে বিরল খনিজের বিশাল মজুদ রয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখা সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই মায়ানমার সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জেনারেল Min Aung Hlaing দেশের ভেতরে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ হারানো অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধারের কৌশল আরও আক্রমণাত্মকভাবে বাস্তবায়ন করছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। মার্চ মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি সীমান্ত অঞ্চলে সেনা উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দখলে থাকা এলাকা পুনর্দখলের নির্দেশ দিয়েছেন।
মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম Global New Light of Myanmar জানিয়েছে, সেনা নেতৃত্ব সম্প্রতি দাবি করেছে যে তারা চিন রাজ্যের ফালাম শহর এবং কাচিন রাজ্যের রাজধানী মিতকিনা ও মান্দালয়ের মধ্যে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। তবে স্বাধীনভাবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মায়ানমার ক্রমাগত সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয়। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ধীরে ধীরে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দখলে নেয়।
বর্তমানে সেনাবাহিনীর লক্ষ্য হলো হারানো কৌশলগত অঞ্চলগুলো পুনরুদ্ধার করা এবং সীমান্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগ রুটের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বিশ্লেষকদের মতে, এই রুটগুলো শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য নয়, বরং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মায়ানমার বিষয়ক বিশ্লেষক সাই কিই জিন সোয়ের মতে, সেনাবাহিনী বর্তমানে এমন এলাকাগুলোকে পুনর্দখল করার চেষ্টা করছে যেগুলো সীমান্ত বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তার মতে, এসব অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারানো সেনাবাহিনীর কৌশলগত অবস্থানকে দুর্বল করেছে, তাই এখন তারা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
তবে এই অভিযানের মানবিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং খাদ্য সংকটের মধ্যে রয়েছে। নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ায় তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকায় বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সেনাবাহিনীর দাবি এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা যাচ্ছে না।
এদিকে সামরিক সরকার সম্প্রতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং ১০০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। তবে অধিকাংশ জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে, যা সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংঘাত এখন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক আগ্রহও বাড়িয়ে তুলেছে।
মায়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে। সীমান্তবর্তী দেশগুলো পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শরণার্থী প্রবাহ এবং অবৈধ বাণিজ্য বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে মায়ানমারের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান দেশটিকে আবারও এক অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিরল খনিজ অঞ্চল ও কৌশলগত বাণিজ্যপথ ঘিরে এই লড়াই শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।