গাজীপুর বিআরটিতে নির্মাণকাজ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে ঈদে চরম যানজট ভোগান্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
  • ৮ বার
গাজীপুর বিআরটিতে নির্মাণকাজ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে ঈদে চরম যানজট ভোগান্তি

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজীপুরে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প এখন ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের জন্য বড় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা নির্মাণকাজ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এই অংশটি এখন যানজটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ঈদের মৌসুমে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, যেখানে মাত্র ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে কয়েক ঘণ্টা।

টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ যানজট। বিশেষ করে মহাসড়ক থেকে বিআরটি লেনে প্রবেশের প্রতিটি পয়েন্টেই তৈরি হচ্ছে থমকে থাকা যানবাহনের সারি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একই চিত্র, যেখানে যাত্রীদের ভোগান্তির যেন কোনো শেষ নেই। অনেক যাত্রী বলছেন, স্বাভাবিক সময়ে যেই পথ আধা ঘণ্টায় পার হওয়া যেত, এখন সেখানে পুরো একটি দিনও লেগে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিআরটি লেনের জন্য স্থাপিত অবকাঠামো ও মাঝপথের স্টেশনগুলো যান চলাচল আরও ধীর করে দিয়েছে। দুই লেনের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। ফলে মহাসড়কের এই অংশটি এখন কার্যত ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যাত্রীদের জন্য। অনেকে এটিকে পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন প্রকল্পের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

ঈদকে কেন্দ্র করে যখন রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গমুখী মানুষের ঢল নেমেছে, তখন এই সড়কের দুর্ভোগ আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে বাড়ি ফেরা মানুষদের অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ছেন। কেউ কেউ বিকল্প পথে যাত্রা করার চেষ্টা করলেও তাতেও মিলছে না স্বস্তি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই প্রকল্পটি চালু রাখা হবে নাকি এর কাঠামো পরিবর্তন করে সাধারণ সড়কে রূপান্তর করা হবে, তা নিয়ে চলছে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা। যদি বর্তমান অবকাঠামো বজায় রেখে প্রকল্প চালু রাখতে হয়, তবে অতিরিক্ত কয়েকশ কোটি টাকা ব্যয় প্রয়োজন হতে পারে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে। তারা মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে। সেই অনুযায়ী ঈদের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, জনগণের ভোগান্তি কমানোই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্প শুরুর সময় থেকেই এর নকশা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ দল শুরু থেকেই সতর্ক করে আসছিল যে, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া এই ধরনের প্রকল্প সফল হবে না। তাদের মতে, এখন আর নতুন করে বড় ধরনের অর্থ ব্যয় না করে বিদ্যমান সড়ককে কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত স্টেশন ও লেনগুলো যান চলাচলের স্বাভাবিক প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এর ফলে সড়কের ধারণক্ষমতা কমে গেছে এবং যানজট বহুগুণ বেড়ে গেছে। তারা বলছেন, প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু অর্থনৈতিক দিক নয়, দীর্ঘমেয়াদী নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রকল্পটি শুরু হয় ২০১১ সালে। এক যুগের বেশি সময় পার হলেও এখনো এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। প্রকল্প ব্যয় ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে দীর্ঘ সময় ও বিপুল ব্যয় সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকে এটিকে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে সমন্বয় ও বাস্তবায়ন দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই প্রকল্পে বারবার পরিবর্তন, কাজের ধীরগতি এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে পুরো ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হয়েছে। এখন ঈদের মতো চাপের সময়ে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর।

অন্যদিকে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে প্রতিদিন। অনেকে বলছেন, উন্নয়নের নামে যে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে, তার দায় কার—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। বিশেষ করে যারা প্রতিদিন এই সড়কে চলাচল করেন, তাদের জন্য এটি এখন এক স্থায়ী দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ঈদের পর সরকার যদি দ্রুত ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে এই সড়কের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। কারণ যানবাহনের চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি প্রকল্পের অসম্পূর্ণ কাঠামো পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।

সব মিলিয়ে গাজীপুরের বিআরটি প্রকল্প এখন আর শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ব্যর্থতার প্রতীক। ঈদের এই সময়ের ভোগান্তি সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে, যেখানে উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেন প্রতিদিনই নতুন করে বাড়ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত