প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর ঐতিহাসিক জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে দেশের প্রধান ঈদের জামাত আগামী ঈদের দিন সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীবাসীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ ঘিরে ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে সার্বিক প্রস্তুতি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা এবং মুসল্লিদের আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবারের আয়োজন আগের তুলনায় আরও আধুনিক ও সুসংগঠিতভাবে সাজানো হয়েছে।
ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, জাতীয় ঈদগাহে আগত মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ের সুযোগ দিতে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, আলাদা নামাজের স্থান এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে মুসল্লিদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করাই এবারের মূল লক্ষ্য।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জনসংযোগ শাখা জানিয়েছে, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ-এর খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক প্রধান ঈদ জামাতে ইমামতি করবেন। তাঁর ইমামতিতে অনুষ্ঠিত জামাতে দেশবরেণ্য আলেম, বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা এবং বিদেশি কূটনীতিকদের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের বিশাল পরিসরকে কেন্দ্র করে এবারও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক অবকাঠামোগত প্রস্তুতি। প্রায় ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই মাঠের মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার ৪০০ বর্গমিটার এলাকা প্যান্ডেলের আওতায় আনা হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, ১২১টি কাতারে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন।
এর মধ্যে ভিআইপি পুরুষদের জন্য পৃথক পাঁচটি কাতার এবং নারী ভিআইপিদের জন্য একটি বিশেষ কাতারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মুসল্লিদের জন্যও পর্যাপ্ত স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রায় ৩১ হাজার পুরুষ মুসল্লি এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার নারী মুসল্লির জন্য পৃথকভাবে নামাজ আদায়ের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নারী মুসল্লিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবারের আয়োজনেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য আলাদা প্রবেশ পথ, পৃথক নামাজের স্থান এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশ্রাম ও অজুর সুবিধাও রাখা হয়েছে। আয়োজকরা বলছেন, পরিবার নিয়ে ঈদের জামাতে অংশ নিতে যেন কেউ কোনো ধরনের ভোগান্তিতে না পড়েন সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মুসল্লিদের যাতায়াত ও প্রবেশ সহজ করতে ঈদগাহ ময়দানে মোট চারটি প্রবেশ ফটক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ভিআইপিদের জন্য, দুটি সাধারণ পুরুষ মুসল্লিদের জন্য এবং একটি নারী মুসল্লিদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নামাজ শেষে সুশৃঙ্খলভাবে বের হয়ে যাওয়ার সুবিধার্থে সাতটি বহির্গমন ফটক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ভিআইপিদের জন্য, পাঁচটি সাধারণ পুরুষ মুসল্লিদের জন্য এবং একটি নারীদের জন্য নির্ধারিত থাকবে।
অজুর ব্যবস্থাকেও আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একসঙ্গে প্রায় ১৪০ জন মুসল্লি অজু করতে পারবেন এমন সুবিধা রাখা হয়েছে। পুরুষদের জন্য ১১৩ জন এবং নারীদের জন্য ২৭ জনের পৃথক অজুখানার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ঈদের জামাতকে আরও আরামদায়ক করতে ঈদগাহে স্থাপন করা হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, পর্যাপ্ত ফ্যান এবং আলোকসজ্জা। নিরাপদ সুপেয় পানির পাশাপাশি পুরো মাঠজুড়ে বিছানো হয়েছে কার্পেট। ভিআইপি কাতারে বিশেষ জায়নামাজ সরবরাহের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আবহাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পানি নিরোধক সামিয়ানা স্থাপন করা হয়েছে যাতে বৃষ্টি হলেও মুসল্লিদের নামাজ আদায়ে বিঘ্ন না ঘটে। পাশাপাশি মাঠের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ টয়লেট এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জানিয়েছে, ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও থাকবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি সহায়তা দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
জাতীয় ঈদগাহকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন তিনটি প্রধান ফটক। আলোকসজ্জা এবং নান্দনিক সাজসজ্জার মাধ্যমে পুরো ঈদগাহ প্রাঙ্গণে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। আয়োজকদের আশা, ধর্মীয় মর্যাদা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে লাখো মুসল্লির অংশগ্রহণে এবারের ঈদ জামাত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে।
প্রতি বছর জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত প্রধান জামাত দেশবাসীর কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতির কারণে এটি জাতীয় পর্যায়ের ধর্মীয় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের জেলা থেকে বহু মানুষ এই জামাতে অংশ নিতে ভোর থেকেই ঈদগাহমুখী হন।
ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা ত্যাগ, সংযম এবং মানবিকতা। জাতীয় ঈদগাহে হাজারো মানুষের একসঙ্গে নামাজ আদায়ের দৃশ্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এদিকে নগর প্রশাসন মুসল্লিদের নির্ধারিত সময়ের আগেই ঈদগাহে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। নিরাপত্তা তল্লাশি এবং সুশৃঙ্খল প্রবেশ নিশ্চিত করতে আগেভাগে মাঠে প্রবেশের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুসল্লিদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।