আদ-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যু, গাফিলতির অভিযোগ মন্ত্রীর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬
  • ৮ বার

প্রকাশ: ২৭ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ এক রাতে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতির ফল বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করবে সরকার।

বুধবার রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত হাসপাতালটির পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটে। হাসপাতাল সূত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মৃত শিশুদের বয়স ছিল এক থেকে দুই দিনের মধ্যে। তারা সবাই অস্ত্রোপচারের পর মায়েদের সঙ্গে পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে অবস্থান করছিল।

ঘটনার পরপরই হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি, উদ্বেগ এবং ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক অভিভাবক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার অবহেলা এবং দায়িত্বে থাকা কর্মীদের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর রমনা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাত দুইটা থেকে তিনটার মধ্যে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে অবস্থানরত এক মা অতিরিক্ত ঠান্ডার অভিযোগ করলে দায়িত্বে থাকা নার্সদের অনুরোধে কক্ষটির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় এক ঘণ্টা এসি বন্ধ থাকার পর কয়েকটি নবজাতকের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ভোরের দিকে শিশুদের অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। এরপর দ্রুত তাদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের চেষ্টা সত্ত্বেও একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট কক্ষে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা না থাকায় এসি বন্ধ হওয়ার পর অক্সিজেনের ঘাটতি বা সাফোকেশনের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয় এবং বিস্তারিত তদন্ত ছাড়া মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয়।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক নাহিদা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের বলেন, পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডটিতে মোট ১১ জন মা এবং ছয় নবজাতক ছিল। নিয়ম অনুযায়ী সন্তান জন্মের পর মা ও শিশুকে একসঙ্গে রাখা হয়। তিনি বলেন, রাতের দিকে মায়েদের অনুরোধে এসি বন্ধ করা হয়েছিল। পরে কয়েকটি শিশুর শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, প্রথমদিকে চিকিৎসকেরা মনে করেছিলেন শিশুদের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু ভোরের পর হঠাৎ পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ছয় নবজাতককেই দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। তাদের মধ্যে দুই শিশু সেখানে নেওয়ার পথেই মারা যায় এবং বাকি চারজনকে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি স্পষ্ট যে হাসপাতালে দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের গাফিলতি ছিল। একটি পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন ছাড়া দীর্ঘ সময় এসি বন্ধ রাখা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, নবজাতকদের চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য নয়।

মন্ত্রী আরও জানান, ঘটনাটি তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে। পাশাপাশি হাসপাতালের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করাও তদন্তের অংশ হবে বলে জানান তিনি।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতক শিশুদের শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল। একটি বন্ধ কক্ষে বায়ু চলাচল কমে গেলে দ্রুত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম কয়েক দিন শিশুদের বাড়তি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হয়। তাই পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ভেন্টিলেশন এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঘটনার পর হাসপাতালের ভেতরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। নিহত শিশুদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছে পুলিশ এবং হাসপাতাল প্রশাসন।

স্বজনদের অভিযোগ, রাতেই শিশুদের অবস্থার অবনতি দেখা দিলেও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কয়েকজন অভিভাবক দাবি করেছেন, চিকিৎসাকর্মীদের আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিলে হয়তো শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হতে পারত।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা বলছেন, দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোর অনেক জায়গায় নিরাপত্তা এবং জরুরি চিকিৎসা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। বিশেষ করে নবজাতক ইউনিট ও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে নিয়মিত তদারকি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চিকিৎসা অবহেলা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যখাতের জবাবদিহি এবং রোগী নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

মর্মান্তিক এই ঘটনায় রাজধানীজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঈদুল আজহার আগ মুহূর্তে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত