প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দঘন পরিবেশে রাজধানীর ঢাকা সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে দেশ গঠন, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছেন সরকারপ্রধান হিসেবে উল্লেখিত Tarique Rahman। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের একার প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের আন্তরিক অংশগ্রহণ এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমেই একটি “কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ” গড়ে তোলা সম্ভব।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা সেনানিবাসের জিয়া কলোনিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ‘মৃত্যুঞ্জয়ী পঁচিশ’ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট আয়োজিত এক প্রীতিভোজ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সেখানে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, সৈনিক, তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং শিশুদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ, পাশাপাশি দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের আবেগঘন বার্তা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে উল্লেখিত AKM Shamsul Islam। প্রীতিভোজ শেষে সরকারপ্রধান ‘পঁচিশ মৃত্যুঞ্জয়ী’ ভবনের সামনে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এই প্রতীকী কার্যক্রমকে অনেকেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রত্যয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
বক্তৃতার শুরুতেই তিনি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে একটি নিরাপদ, আধুনিক ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ দেখতে চান, সরকার ধাপে ধাপে সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে সমানভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ঢাকা সেনানিবাসের সঙ্গে নিজের শৈশবের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, এই এলাকার প্রতিটি রাস্তা, ভবন এবং পরিবেশের সঙ্গে তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় ও পারিবারিক অভিজ্ঞতার সম্পর্ক রয়েছে।
১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের সময়কার সেনানিবাসের পরিবেশের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তখনকার ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ছিল অনেকটা নিরিবিলি ও জঙ্গলে ঘেরা এলাকা। বর্তমানের আধুনিক অবকাঠামো তখন ছিল না। ছোট ছোট রাস্তা, গাছপালায় ঘেরা পরিবেশ এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও সেখানকার জীবন ছিল স্মৃতিময়।
তিনি স্মরণ করেন, ছোটবেলায় একা একা সিএমএইচে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার অভিজ্ঞতা, স্টাফ সার্জন মেজর আনোয়ারের সঙ্গে পরিচয় এবং বিকেলবেলা বন্ধুদের সঙ্গে সাইকেল চালিয়ে সিগন্যালের পাশের মসজিদে যাওয়ার মুহূর্তগুলো এখনও তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে। এসব স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে কিছু সময়ের জন্য তাঁর কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে জানান।
অনুষ্ঠানে তিনি দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাসদস্যদের অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষ করে ঈদের মতো উৎসবের সময়েও যারা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবারের কাছে যেতে পারেন না, তাঁদের আত্মত্যাগ জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সৈনিকেরা অনেক সময় ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেন, যা রাষ্ট্র ও জনগণের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
কয়েক মাস আগে রাজধানীতে দুটি সংবাদপত্র কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি সেনাসদস্যদের সাহসিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা জীবনবাজি রেখে ১৮ জন সাংবাদিককে নিরাপদে উদ্ধার করেছিলেন। এ ধরনের মানবিক ও সাহসী ভূমিকা দেশের মানুষের মনে আস্থা ও শ্রদ্ধা তৈরি করে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, রাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের সন্তানদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবে এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপদ বোধ করবে এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ন্যায়সঙ্গতভাবে পাবে। এজন্য সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের মতো ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে এমন বক্তব্য জনগণের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সামনে দেওয়া এই বক্তব্যে জাতীয় ঐক্য, দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার যে আহ্বান উঠে এসেছে, তা সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সেনাসদস্যদের অনেকেই সরকারপ্রধানের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং পরে তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। শিশুদের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক আচরণও অনুষ্ঠানে উপস্থিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কেউ কেউ বলেন, পুরো আয়োজনটি ছিল অনেকটা পারিবারিক পরিবেশের মতো, যেখানে আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মানবিক আবেগও ছিল স্পষ্ট।
প্রীতিভোজ শেষে দেশ, জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। সেখানে দেশকে শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করা হয়।
সব মিলিয়ে ঈদুল আজহার এই বিশেষ দিনে সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানটি শুধু একটি শুভেচ্ছা বিনিময় বা আনুষ্ঠানিক আয়োজনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং এটি দেশ গঠন, দায়িত্ববোধ, স্মৃতি ও মানবিকতার এক বহুমাত্রিক বার্তা বহন করেছে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।