ইসলামী ব্যাংক ঘিরে উত্তেজনা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১ জুন, ২০২৬
  • ৩৩ বার

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত গ্রাহকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ, জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহারের ঘটনায় সোমবার (১ জুন) রাজধানীর মতিঝিল এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে ঘিরে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকিং খাতেই নয়, সাধারণ আমানতকারী এবং ব্যবসায়ী মহলেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সোমবার সকাল থেকেই ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের সদস্য ও সমর্থকরা। হাতে ব্যানার, ফেস্টুন এবং বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিল এবং তার পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও সুশাসনের প্রশ্নে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে আমানতকারীদের আস্থা রক্ষার স্বার্থে এ নিয়োগ পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সড়ক ছেড়ে সরে যেতে অনুরোধ জানায়। তবে আন্দোলনকারীরা তাদের অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করলে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। পরে জলকামান ব্যবহার এবং টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অফিসে সাময়িকভাবে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়।

ঘটনার পর বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও আন্দোলন পুরোপুরি থেমে যায়নি। কিছুক্ষণ পর তারা আবারও আশপাশের এলাকায় জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে। মতিঝিলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

আন্দোলনকারীদের দাবি, তাদের কর্মসূচি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। তারা অভিযোগ করেন, কোনো ধরনের উসকানি বা সহিংসতা ছাড়াই পুলিশ শক্তি প্রয়োগ করেছে। তাদের মতে, ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং চেয়ারম্যানের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাংবিধানিক অধিকার তাদের রয়েছে। সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা পুলিশের বাধার মুখে পড়েছেন।

অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন জানান, কয়েকশ আন্দোলনকারী ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে কার্যত অবরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। এর ফলে মতিঝিলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং ও আর্থিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল এবং এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনকারীদের একাধিকবার সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তারা নির্দেশনা মানেননি। বরং কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি এবং উত্তেজনাপূর্ণ আচরণ করেন।

ডিসি নাসিরুদ্দিন আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ প্রথমে সতর্কবার্তা দেয়। এরপরও তারা সরে না গেলে আইনানুগ পদ্ধতিতে জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তার দাবি অনুযায়ী, ঘটনাকালে পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাসহ অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

বর্তমান সংকটের পেছনে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক পরিবর্তন। গত ২৪ মে ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে হঠাৎ চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন অধ্যাপক ড. এম জুবায়দুর রহমান। ওইদিনই তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকের একাংশের গ্রাহক এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ নিয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছতা অনুসরণ করা হয়নি। তাদের আশঙ্কা, অতীতে আলোচিত কিছু গোষ্ঠীর প্রভাব আবারও ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ফিরে আসতে পারে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংকের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কোটি কোটি গ্রাহক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমানত, বিনিয়োগ এবং ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যাংকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে এর শীর্ষ নেতৃত্বে যেকোনো পরিবর্তন সাধারণ গ্রাহক, বিনিয়োগকারী এবং আর্থিক খাতের পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্বেগ তৈরি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই নেতৃত্ব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অংশীজনদের আস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্দোলন বা প্রতিবাদের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে সংঘর্ষের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ আন্দোলনকারীদের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছেন, আবার কেউ ব্যাংকিং কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে বিষয়টি এখন কেবল একটি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা জনআস্থা, সুশাসন এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।

বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষও এখন পর্যন্ত চেয়ারম্যানের নিয়োগ বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্তের আভাস দেয়নি।

ফলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সৃষ্ট এই সংকট আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন সবার নজরে। গ্রাহকদের আস্থা, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের পদক্ষেপই আগামী পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত