প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর ‘ড্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক’ প্রদান করা হচ্ছে। আগামী ৫ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এ সম্মাননা তুলে দেবেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষায় জীবন উৎসর্গ করা সদস্যদের স্মরণ করা হবে।
জাতিসংঘের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এবারের তালিকায় মোট ৬৮ জন সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর এই পদক প্রদান করা হবে। তাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে রয়েছেন ছয়জন সদস্য, যারা দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারান। অনুষ্ঠানটি জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত।
মরণোত্তর সম্মাননা পাওয়া বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা হলেন মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. সবুজ মিয়া, মো. মাসুদ রানা, মো. মোমিনুল ইসলাম, শামীম রেজা এবং সান্ত মণ্ডল। তারা সবাই ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের অন্তর্বর্তী নিরাপত্তা বাহিনী (ইউএনআইএসএফএ)-তে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই সময় এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শান্তিরক্ষীদের জীবনের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবুও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় সাড়ে চার হাজার শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন। এবারের অনুষ্ঠানে তাদের স্মরণে জাতিসংঘ মহাসচিব পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এটি শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বর্তমানে বিশ্বের ১১৮টি দেশ জাতিসংঘের ১১টি শান্তিরক্ষা মিশনে জনবল সরবরাহ করছে। এসব মিশনে বেসামরিক, সামরিক ও পুলিশ সদস্য মিলিয়ে ৫০ হাজারেরও বেশি শান্তিরক্ষী কর্মরত আছেন। সবচেয়ে বড় শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম, যা বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে আবেই, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, সাইপ্রাস, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, লেবানন, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান এবং পশ্চিম সাহারা—এমন বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে দায়িত্ব পালন করছে। এসব মিশনে ২৭৭ জন নারীসহ ৪ হাজারের বেশি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তাদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করেছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে বিশ্ব শান্তি রক্ষার অন্যতম কার্যকর ও পরীক্ষিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক সংঘাত বৃদ্ধি এবং আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তার ঘাটতি এই কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এ প্রেক্ষাপটে এবারের শান্তিরক্ষা দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’, যা টেকসই রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শান্তিরক্ষীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, শান্তিরক্ষা শুধু সংঘাত মোকাবিলা নয়, বরং এটি স্থিতিশীলতা ও আশার পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে এর জন্য ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সমর্থন অপরিহার্য।
অন্যদিকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ-পিয়েরে লাক্রোয়া বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষীরা বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন এবং সহিংসতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
এবারের অনুষ্ঠানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখার জন্য আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রদান করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে ‘ক্যাপ্টেন এমবায়ে দিয়াগনে মেডেল ফর এক্সেপশনাল কারেজ’, ‘মিলিটারি জেন্ডার অ্যাডভোকেট অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ এবং ‘ইউএন উইমেন পুলিশ অফিসার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’।
বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের এই মরণোত্তর সম্মাননা শুধু তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি নয়, বরং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবিচল ভূমিকারও একটি শক্তিশালী প্রতীক। তাদের এই অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক মহল।