ইথিওপিয়ার নির্বাচনে জয়ী হতে চলেছে আবি আহমেদের দল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ১২৫ বার
ইথিওপিয়ার নির্বাচনে জয়ী হতে চলেছে আবি আহমেদের দল

প্রকাশ: ০২ জুন  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আফ্রিকার দ্বিতীয় জনবহুল দেশ ইথিওপিয়ায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সংসদীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচন। দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই গত ১ জুন সোমবার ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ‘প্রসপারিটি পার্টি’ এই নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পথে রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা ধারণা করছেন। ইথিওপিয়ার প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৫ কোটির বেশি ভোটার এই নির্বাচনে নিবন্ধিত ছিলেন, যা দেশটির গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকছে।

নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ নিজের প্রতিক্রিয়ায় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি আত্মবিশ্বাসের সুরে ঘোষণা করেছেন যে, ইথিওপিয়ার জনগণ প্রমাণ করেছে যে নিজেদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের বাইরের কোনো শক্তির পরামর্শের প্রয়োজন নেই। আগামী পাঁচ বছর দেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সময় হতে যাচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। এদিকে, আফ্রিকান ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান এবং কেনিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি উহুরু কেনিয়াত্তা জানিয়েছেন, নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভোটগ্রহণ সামগ্রিক দিক থেকে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

তবে এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি যে নানামুখী জটিলতার মধ্য দিয়ে পার হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় টিগ্রে অঞ্চলে দুই বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি, যার ফলে ওই অঞ্চলে কোনো ভোটগ্রহণই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারপারসন মেলাটওয়ার্ক হাইলু জানিয়েছেন, নিরাপত্তাজনিত সংকটের কারণে আমহারা ও ওরোমিয়া অঞ্চলের ১৪৩টি ভোটকেন্দ্র খোলার পরিস্থিতি ছিল না। এই দুটি বৃহৎ অঞ্চলেই বর্তমানে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে, যার ফলে অনেক নির্বাচনী এলাকায় ভোট স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। এই অঞ্চলের অস্থিরতা কেবল নির্বাচনকেই ব্যাহত করেনি, বরং দেশটির অভ্যন্তরীণ অখণ্ডতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আবি আহমেদ ছিলেন বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের শত্রুতার অবসান ঘটানোর স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল। সে সময় অনেকের ধারণা ছিল, তিনি ইথিওপিয়াকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার পথে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেই আশাবাদ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবি আহমেদের সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সাংবাদিকদের হয়রানি ও দেশের অভ্যন্তরে নৃশংস সামরিক অভিযান চালানোর গুরুতর অভিযোগ তুলেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খণ্ডিত বিরোধী দলগুলোও অভিযোগ করেছে যে, সরকার তাদের নেতাদের গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধার সৃষ্টি করে মাঠ ফাঁকা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

নির্বাচনী মাঠের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রসপারিটি পার্টি নির্বাচনের আগে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল। সরকারি দলের প্রার্থীরা মূলত সরকারের অর্থনৈতিক রেকর্ড, খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে প্রচারণা চালিয়েছেন। তবে বিরোধীরা বলছে, সরকার প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে নির্বাচনী মাঠ দখল করে নিয়েছে। অনেক স্থানে বিরোধী দলকে জনসভা করতে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন মূলত ক্ষমতাসীনদের বৈধতা পুনরুদ্ধারের একটি প্রতীকী ব্যায়াম মাত্র, যেখানে প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ সীমিত।

ইথিওপিয়ার নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১১ জুনের মধ্যে এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা রয়েছে। ফলাফলের পর গঠিত নতুন সংসদই পরবর্তী সরকার নির্ধারণ করবে এবং বিজয়ী দল থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নাম ঠিক করা হবে। আবি আহমেদ এই নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম সুশৃঙ্খল নির্বাচন বলে দাবি করলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বলছে দেশ গভীর সংকটে বিভক্ত। গৃহযুদ্ধ ও জাতিগত সংঘাতের রেশ কাটিয়ে একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা আবি আহমেদের জন্য আগামী দিনগুলোতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

পরিশেষে বলা যায়, ইথিওপিয়ার এই নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক রুটিন কাজ নয়, বরং এটি দেশটির ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার এক অগ্নিপরীক্ষা। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক নির্বাচনী আবহ বা কৌশল ইথিওপিয়ার প্রেক্ষাপটে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ওই ১১ জুনের ফলাফলের দিকে। সরকার কি সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দেশকে গৃহযুদ্ধের পথ থেকে শান্তির পথে ফিরিয়ে নিতে পারবে, নাকি দমন-পীড়নের নীতিই দেশটিকে আরও গভীর খাদের দিকে ঠেলে দেবে—সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন ইথিওপিয়ার রাজনীতির মূল আলোচনার বিষয়বস্তু।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com