প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিচারিক কার্যক্রমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে খাগড়াছড়িতে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে মো. শাহিন নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন আদালত। সোমবার দুপুরে খাগড়াছড়ির শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শায়লা শারমিন এই ঐতিহাসিক ও ন্যায়বিচারপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই রায়ের মাধ্যমে একটি বর্বরোচিত ঘটনার বিচারিক সমাপ্তি ঘটল। সাত বছরের সেই অবুঝ শিশুর ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিক নির্যাতনের এই ঘটনাটি কেবল খাগড়াছড়ি নয়, বরং গোটা দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। অপরাধী মো. শাহিন পেশায় একজন চা দোকানি হলেও, তাঁর ভেতরে যে অমানবিক রূপ লুকিয়ে ছিল তা এই রায়ের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হলো।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত বছরের ২৫ জুলাই। রামগড়ের স্থানীয় একটি মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল ভুক্তভোগী সেই শিশু। কোনো এক বিকেলে তাকে প্রলোভন দেখিয়ে এবং সুযোগ বুঝে চা দোকানি শাহিন পাশবিক নির্যাতন চালায়। এই অমানবিক ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ওই শিশুর আর্তনাদে এবং কান্নায় স্থানীয় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল সেদিন। অসহায় সেই শিশুর বাবা পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে তাৎক্ষণিকভাবে বাদী হয়ে রামগড় থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং অভিযুক্ত মো. শাহিনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসে।
মামলাটি দায়ের করার পর থেকেই খাগড়াছড়ির মানুষের দৃষ্টি ছিল আদালতের দিকে। শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াটি পরিচালনা করেছেন। মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং ভুক্তভোগী শিশুর জবানবন্দি শোনার পর বিচারক কোনো প্রকার নমনীয়তা না দেখিয়ে অপরাধের ভয়াবহতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি মো. শাহিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় পাঠ করার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামির অভিব্যক্তিতে কোনো অনুশোচনা ছিল কি না, তা নিয়ে উপস্থিত আইনজীবীদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। তবে বিচারক শায়লা শারমিনের এই সাহসী সিদ্ধান্ত দেশে চলমান শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সৃজনী ত্রিপুরা রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আদালতের কার্যকারিতার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে, যা ভুক্তভোগী পরিবারকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। সমাজে যখন নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে, তখন এই ধরনের রায় অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে। তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ এ মামলার প্রতিটি ধাপে শক্ত অবস্থান নিয়েছে এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও সাক্ষ্য প্রদানের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনি লড়াইয়ের এই বিজয় কেবল একটি রায়ের জয় নয়, এটি আইনের শাসনের জয়।
অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী বেদারুল ইসলাম জানিয়েছেন, তারা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ এবং রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। আইনি প্রক্রিয়ায় যেকোনো দণ্ডিত ব্যক্তি আপিলের সুযোগ পাবেন—এটি সংবিধানসম্মত অধিকার। সেই অধিকার বলেই তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এই আপিল প্রক্রিয়া রায় কার্যকর হওয়ার গতিকে কতটা দীর্ঘায়িত করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ এবং সমাজকর্মীরা। শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে কেবল আইন তৈরি করলেই হবে না, বরং এর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন তারা।
এই ঘটনাটি সমাজ ব্যবস্থার এক অন্ধকার দিকের দিকে আঙুল নির্দেশ করে। কেন একজন চা দোকানি বা পরিচিত ব্যক্তি এমন ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, তা সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য এক বড় গবেষণার বিষয়। পারিবারিক নজরদারি, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে এই ধরনের ঘটনা নিয়মিত ঘটেই চলেছে। ভুক্তভোগী শিশুর মানসিক ট্রমা বা পরবর্তী জীবন নিয়ে পরিবারগুলো যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটায়, তার কোনো তুলনা হয় না। আদালত যদিও মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে অপরাধের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করেছেন, কিন্তু সেই শিশুর হারানো শৈশব কি আর কখনো ফিরে আসবে? এই প্রশ্নটি এখনো প্রতিটি সচেতন মানুষের মনে অনুরণিত হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিক সমাজ বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। তারা মনে করেন, শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পাহাড় ও সমতলের প্রতিটি প্রান্তে যেন শিশুদের নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকে, তার জন্য নিয়মিত নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। চা দোকানি শাহিনের এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সমাজকে এই বার্তা দিল যে, অপরাধ করার পর পার পাওয়ার সুযোগ নেই। আজকের এই রায় কেবল একটি দালিলিক নথি নয়, বরং এটি প্রতিটি অপরাধীর জন্য একটি বড় হুঁশিয়ারি।
পরিশেষে বলা যায়, ন্যায়বিচারের এই আদেশের মধ্য দিয়ে খাগড়াছড়িবাসী এক ধরনের শান্তি অনুভব করছে। বিচারক শায়লা শারমিনের এই রায় প্রমাণ করেছে যে, দেশের বিচার বিভাগ শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে সর্বদা সোচ্চার ও অবিচল। উচ্চ আদালতে আপিলের প্রক্রিয়া চললেও, ট্রাইব্যুনালের এই রায় অপরাধী চক্রের মনে প্রকম্পন সৃষ্টি করবে বলেই আশা করা হচ্ছে। সাত বছরের সেই অবুঝ শিশুর চোখের জল ও কষ্টের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই আজ আইন তার নিজস্ব গতিতে চলল। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিশুর ভাগ্য এমন ভয়াবহ অন্ধকারাচ্ছন্ন না হয়, সেই কামনাই এখন পুরো দেশবাসীর। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার, তা এই রায়ের মধ্য দিয়ে আরেক ধাপ এগিয়ে গেল।