ঘুমন্ত কিশোরীর ওপর ট্রাক, পাথরচাপায় অকাল মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার
ঘুমন্ত কিশোরীর ওপর ট্রাক, পাথরচাপায় অকাল মৃত্যু

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার নলদী গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রোববার মধ্যরাতে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে শামিমা আক্তার সেতু নামের এক মেধাবী কিশোরী। পাথরবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা ঢুকে পড়ে তাদের বসতঘরের ভেতরে, আর মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটি পরিণত হয় পাথরের স্তূপে। আট বছর বয়সী সেতু সেই পাথরের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তার ছোট বোন মিতু খানমও গুরুতর আহত অবস্থায় এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। একটি পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে, যা পুরো এলাকাকে এক গভীর বিষাদগ্রস্ত করে তুলেছে।

ঘটনার সূত্রপাত রোববার গভীর রাতে। নড়াইল শহর থেকে লোহাগড়া উপজেলার মিঠাপুর হয়ে ব্রাহ্মণডাঙ্গায় নির্মাণাধীন একটি সেতুর জন্য পাথরবাহী ট্রাকটি রওনা হয়েছিল। চালক হয়তো জানতেন না যে, এই যাত্রা কেবল একটি সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে নয়, বরং একটি পরিবারের বিনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। রাত বারোটার দিকে নলদী এলাকার সরু রাস্তায় প্রবেশ করে ট্রাকটি পথ হারিয়ে ফেলে। অত্যন্ত সংকীর্ণ সেই রাস্তায় ভারী মালবাহী ট্রাকটির নিয়ন্ত্রণ রাখা চালকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের হাফিজার মোল্যার বসতঘরের ওপর আছড়ে পড়ে উল্টে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটি পাথর ও ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে যায়। সেই ঘরটি ছিল সেতুর আপন নীড়, যেখানে সে তখন শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল।

শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। ট্রাকটি উল্টে পড়ায় অসংখ্য পাথরের স্তূপ পুরো ঘরটিকে ঢেকে ফেলেছিল। গ্রামবাসীরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে পাথর সরিয়ে দুই বোনকে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকারীরা যখন তাদের খুঁজে পান, ততক্ষণে সেতুর শরীর থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। তার নিথর দেহটি দেখে উপস্থিত গ্রামবাসী থেকে শুরু করে উদ্ধারকারীদের সবার চোখ ভিজে ওঠে। সেতুর ছোট বোন মিতু খানম তখনো শ্বাস নিচ্ছিল, তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নড়াইল জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। মিতু এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। এই অভাবনীয় ট্র্যাজেডি স্থানীয় মানুষের মনে এক গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। একটি সাধারণ রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় এমন মৃত্যু হবে তা ছিল কল্পনাতীত।

নিহত শামিমা আক্তার সেতু নলদী বি এস এস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পড়ালেখায় অত্যন্ত মনোযোগী এবং পরিবারের আশা-ভরসার প্রতীক ছিল এই কিশোরী। তার বাবা হাফিজার মোল্লা একজন কাঁচামাল ব্যবসায়ী। অভাবের সংসার হলেও নিজের সন্তানদের পড়াশোনা নিয়ে তার অনেক বড় স্বপ্ন ছিল। ট্রাকটি যখন ঘরের ওপর পড়ে, তখন পরিবারের সদস্যরা অন্য ঘরে ছিলেন কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কিন্তু যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো, একটি পরিবারের সব আলো নিভে গেছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। দুর্ঘটনার পর ট্রাকচালক ঘটনাস্থল থেকে কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। অপরাধী চালককে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশ প্রশাসন দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। লোহাগড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রহমান জানিয়েছেন যে, তারা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছেন। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে শোকাতুর পরিবার এখনো ঘোরের মধ্যে রয়েছে। তারা কোনো আইনি অভিযোগ দায়ের করার মতো মানসিক অবস্থায় নেই। আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবুও একটি প্রশ্ন বারংবার সামনে চলে আসছে—কে জবাব দেবে এই অকাল মৃত্যুর? কেন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাতে এভাবে ভারী যানবাহন চলাচল করার অনুমতি দেওয়া হয়? কেন চালকরা এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে গাড়ি চালান?

এই দুর্ঘটনাটি আমাদের দেশের সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলছে। নিয়ম অনুযায়ী, সরু রাস্তায় ভারী যান চলাচলের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, রাত হলেই ট্রাক বা অন্যান্য ভারী যানবাহনগুলো ট্রাফিক আইন তোয়াক্কা না করে গ্রামের ভেতর দিয়ে চলাচল করে। এই বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়শই প্রাণ দিতে হয় নিরপরাধ মানুষদের। নলদী গ্রামের আজকের এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম গাফিলতির এক করুণ প্রতিচ্ছবি। পাথরবোঝাই ভারী ট্রাকের ওজন সহ্য করার মতো রাস্তা কি সেই এলাকাগুলোতে ছিল? চালকের মাদকাসক্তি বা অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণেও কি এমনটি ঘটতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।

একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সেতু যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিল, তার সেই স্বপ্ন ধুলোয় মিশে গেছে ট্রাকের পাথরের নিচে। পরিবারের কান্নায় এখন নলদীর আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারা হয়তো কখনোই ভুলতে পারবে না সেই রাতের ভয়াবহ শব্দ এবং এরপর নেমে আসা অন্ধকার। মিতু এখন হাসপাতালে লড়াই করছে সুস্থ হওয়ার জন্য, তার কানে হয়তো এখনো ট্রাকের শব্দ ও পাথরের আঘাতের প্রতিধ্বনি বাজে। এই কিশোরীদের অধিকার ছিল একটি নিরাপদ জীবনের, একটি নিরাপদ আবাসের। কিন্তু আমাদের অব্যবস্থাপনা তাদের সেই অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা আজ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি পরিবারের অস্তিত্বের ওপর বড় ধরণের আঘাত। আইনি প্রক্রিয়া তো চলবেই, ঘাতক চালককে ধরা হবে হয়তো, কিন্তু সেতুর জীবন কি আর ফিরে আসবে? সমাজের প্রতিটি স্তরে আজ সচেতনতা প্রয়োজন। ভারী যানবাহন চলাচলের সময় জনবসতিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলা এবং রাতে চালকদের দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করব, নড়াইল প্রশাসন এই ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে চালককে দ্রুত গ্রেপ্তার করবে এবং ভবিষ্যতে এমন কোনো অকাল মৃত্যু যাতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেবে। সেতুর আত্মত্যাগ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের প্রাণের চেয়ে বড় কোনো উন্নয়ন বা অবকাঠামো হতে পারে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত