ময়মনসিংহে যুবককে গলা কেটে হত্যা: মামলা দায়ের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৪ বার
ময়মনসিংহে যুবককে গলা কেটে হত্যা: মামলা দায়ের

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ময়মনসিংহ নগরের ৩৬ বাড়ি কলোনি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাজিব আহম্মেদ নামের এক যুবককে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় শহরজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা মো. আবদুল হামিদ বাদী হয়ে বাড়ির মালিকসহ মোট ১১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। রোববার মধ্যরাতে দায়ের করা এই মামলার পর ময়মনসিংহের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে নতুন করে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। রাজিবের মতো একজন মানুষকে দিনের আলোয় এমন নৃশংসভাবে হত্যা করার ঘটনাটি কেবল একটি অপরাধই নয়, এটি মানবিক সম্পর্কের চরম অবক্ষয়ের এক করুণ দলিল।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, প্রায় ১৫ দিন আগে রাজিব আর কে মিশন রোড এলাকার আবদুল হামিদের ছেলে হিসেবে এই ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। বাসাটি নেওয়ার পর থেকেই বাড়ির মালিক পারুল বেগমের সঙ্গে রাজিবের নানা বিষয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মালিকপক্ষ তাঁকে দ্রুত বাসা ছাড়ার জন্য নিয়মিত চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। শুধু চাপ নয়, বাসা ছাড়ার জন্য তাঁকে বিভিন্ন সময়ে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার দিন সকালে বাসা ছাড়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবারও বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই বাড়ির মালিক ও তাঁর ছেলেরা অন্য আসামিদের সহযোগিতায় রাজিবের কক্ষে ঢুকে তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

নিহতের বাবা আবদুল হামিদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ছেলের নিথর দেহ শয়নকক্ষের বিছানায় পড়ে থাকতে দেখেন। এই দৃশ্য দেখার পর তাঁর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল আশপাশের পরিবেশ। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করলে পুলিশ, সিআইডি এবং পিবিআইয়ের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন এবং ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠান। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রাজিবকে হত্যার ঠিক আগ মুহূর্তে হামলাকারীরা বাসার সামনে থাকা তাঁর চাচাতো ভাই মো. শুভর একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করে। এটি এক ধরণের ভীতি প্রদর্শনের কৌশল ছিল কি না, তা নিয়েও এখন তদন্ত চলছে। হত্যাকাণ্ডের পর জেলা ডিবি পুলিশ সজল ও রনি নামের দুজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়, যারা পরে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

ঘটনার তদন্ত ও গুরুত্ব বিবেচনা করে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল করিম জানিয়েছেন যে, এই মামলাটি এখন পিবিআই বা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন তদন্ত করবে। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় পিবিআই ময়মনসিংহের পুলিশ পরিদর্শক মো. মোজাম্মেল হককে এর তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পিবিআই ইতিমধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত মূল অভিযুক্তদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছে এবং তাদের হেফাজতে নিয়েছে বলে প্রাথমিক সূত্রে জানা গেছে। রাজিবের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

নিহত রাজিবের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন এখন এক অপূরণীয় ক্ষতির শোকে স্তব্ধ। কোনো এক সামান্য বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিরোধের জেরে যে জীবন প্রদীপ এভাবে নিভে যেতে পারে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। নিহতের বাবা মো. আবদুল হামিদ ন্যায়বিচারের আশায় এখন পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন। পিবিআইয়ের মতো দক্ষ একটি সংস্থা মামলাটি তদন্ত করায় এলাকাবাসী আশাবাদী যে, প্রকৃত খুনিরা আইনের আওতায় আসবে এবং তারা সর্বোচ্চ শাস্তির সম্মুখীন হবে। ময়মনসিংহে এই ধরনের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে নতুন করে আঙুল তুলছে। ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তা এবং বাড়ির মালিকদের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরির সময় এসেছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন যে, তাঁরা মামলার প্রতিটি তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করছেন। আসামি সজল ও রনিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল রহস্য বের করার চেষ্টা চলছে। এখনো পর্যন্ত মুখ না খুললেও, পুলিশের দাবি যে, জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিটি স্তরে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছে যা তদন্তকে ত্বরান্বিত করবে। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য যদি নিছক বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ হয়, তবে সেটি হবে এক জঘন্য অপরাধ। আর যদি এর পেছনে অন্য কোনো গোপন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকে, তাও বেরিয়ে আসবে পিবিআইয়ের তদন্তে।

আমরা আশা করব, ময়মনসিংহের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি যেন ধামাচাপা না পড়ে। পিবিআইয়ের তদন্ত যেন স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ হয়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একজন যুবককে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার পর এলাকায় যে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার নিরসনে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি। রাজিবের অকাল মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই নেই। অপরাধী যে-ই হোক, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কেউ যেন আইনের হাত থেকে পার না পায়, সেটিই এখন ময়মনসিংহের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। রাজিবের আত্মা শান্তি পাক এবং তাঁর পরিবার ন্যায়বিচার লাভ করুক—এই প্রত্যাশা এখন সকলের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত