হামে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু: বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ১৩ বার
হামে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু: বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শিশুস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া এই রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল যেন থামছেই না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সোমবারের নিয়মিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই অকাল মৃত্যুগুলোতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারগুলোর মাঝে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৪১ জনে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি ভয়াবহ সংকেত। শিশুদের জীবন রক্ষার লড়াইয়ে এই মরণব্যাধি যেন এখন এক বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১০৬টি শিশু। এই পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, বরং প্রতিটি আক্রান্ত শিশুর পেছনে রয়েছে তাদের মা-বাবার উদ্বেগ ও দীর্ঘশ্বাস। গত কয়েক মাস ধরে সারাদেশে যে হারে হাম ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যদিও নিশ্চিত হামে মৃত্যুর হার উপসর্গজনিত মৃত্যুর তুলনায় কম, তবুও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারী শিশুর সংখ্যাই প্রকৃত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি দিনই নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে, হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

হাম মূলত একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আক্রমণ করে। সঠিক সময়ে টিকা না পাওয়ার কারণে কিংবা সচেতনতার অভাবে অনেক শিশুই এই মরণব্যাধির কবলে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৬৪৮ শিশু এবং নিশ্চিত হামে মারা যাওয়া ৯৩ জন শিশুকে যোগ করলে মৃত্যুর মোট সংখ্যাটি ৭৪১-এ পৌঁছায়। এই বিশাল সংখ্যক মৃত্যু আমাদের দেশের শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থার প্রতি এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি রোধে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের করুণ অবস্থা দেখে চিকিৎসক ও সেবাদানকারী কর্মীরাও উদ্বিগ্ন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিশুরা শুরুতে সাধারণ জ্বরের লক্ষণ নিয়ে আসছে, কিন্তু পরবর্তীতে তা জটিল আকার ধারণ করছে এবং হামের উপসর্গে রূপ নিচ্ছে। এর ফলে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অনেক শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে হামের টিকার কভারেজ শতভাগ নিশ্চিত করতে না পারলে এই মৃত্যু থামানো সম্ভব হবে না। পরিবারগুলোতে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন যাতে লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে শিশুরা দ্রুত চিকিৎসাসেবা পেতে পারে।

এদিকে, আক্রান্তের হার ক্রমবর্ধমান থাকায় হাসপাতালগুলোতে ভিড় বাড়ছে। সাধারণ শয্যা থেকে শুরু করে আইসিইউ পর্যন্ত অনেক জায়গায়ই শিশুদের সংকটাপন্ন অবস্থার চিত্র ফুটে উঠছে। অভিভাবকদের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সন্তানকে সুরক্ষিত রাখতে কী করণীয়, তা নিয়েও তারা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে, শিশুরা যদি উচ্চ তাপমাত্রায় জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং শরীরের চামড়ায় লালচে র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত জল পানের মাধ্যমে শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।

হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি মনিটর করতে হবে। বিশেষ করে যে সব এলাকায় শিশু মৃত্যুহার বেশি, সেখানে বিশেষ টিম পাঠিয়ে টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। হামের ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মূল অস্ত্রই হলো টিকা। যারা টিকা নেওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও জনাকীর্ণ স্থানে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়, তাই শিশুদের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখার ব্যাপারে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, শিশুদের অকাল মৃত্যুতে ভরা এই সংবাদটি দেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের জন্য এক বিরাট কষ্টের কারণ। ৭৪১টি শিশুর জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়া মানে হলো ৭৪১টি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি। এই মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর এখন বড় দায়িত্ব হলো এই মহামারি পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও দ্রুত কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। প্রতিটি শিশুর জীবন অমূল্য, আর সেই জীবন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়কেই পালন করতে হবে। আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসবে এবং নতুন করে কোনো শিশুর মৃত্যু হবে না—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ। হামের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আমাদের জিততেই হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত