প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
উত্তরের শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাতিঘর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আজ সাফল্যের ৭৪ বছরে পদার্পণ করেছে। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই মহান এক স্বপ্নের হাত ধরে যে বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বড়কুঠির সীমিত পরিসরের সেই ছোট প্রতিষ্ঠানটি সময়ের বিবর্তনে আজ প্রায় তিনশ একর ক্যাম্পাসের বিশাল মহীরুহে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটি জাতীয় সংকট ও সন্ধিক্ষণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার মেধা ও মনন দিয়ে দেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সবার মাঝে এক আনন্দঘন ও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ব্রিটিশ আমলে রাজশাহীর অবহেলিত জনগোষ্ঠীর উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন পূরণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিল তৎকালীন সমাজ সচেতন মানুষ। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যখন পাকিস্তান সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে উচ্চশিক্ষার কাঠামো গড়তে চেয়েছিল, তখন রাজশাহীর বিদগ্ধজনেরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। স্যাডলার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রাজশাহীতে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। অবশেষে ১৯৫৩ সালে পূর্ববঙ্গ আইনসভায় ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস হওয়ার মাধ্যমে সেই বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটে। ড. ইতরাত হোসেন জুবেরীর সুযোগ্য নেতৃত্বে মাত্র সাতটি বিভাগ, পাঁচজন শিক্ষক এবং ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ তার বিশালতা ও ঐতিহ্যের গৌরবে অনন্য।
বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১২টি অনুষদের অধীনে ৫৯টি বিভাগ ও ছয়টি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে জ্ঞান বিস্তারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ৩০ হাজারেরও বেশি নিয়মিত শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখরিত এই ক্যাম্পাস কেবল ডিগ্রি প্রদানের কারখানা নয়, বরং মুক্তবুদ্ধি চর্চার শ্রেষ্ঠ আখড়া। এক হাজার ১৩০ জন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এখানে পাঠদান ও গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ১১টি ছাত্র হল ও ছয়টি ছাত্রী হলে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক ডরমিটরিসহ উচ্চতর গবেষণায় নিয়োজিত ৭৭৬ জন শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে নিরলস কাজ করছেন। অবকাঠামোগত উন্নয়নেও বিশ্ববিদ্যালয়টি পিছিয়ে নেই; নতুন নতুন আবাসিক হল ও একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ ক্যাম্পাসের চেহারাকে ক্রমশ আধুনিক করে তুলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের কথা বলতে গেলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের সেই রক্তিম অধ্যায়গুলোর কথা চলে আসে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ৯০ ও ২৪ সালের গণতান্ত্রিক লড়াই—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন সম্মুখসারিতে। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে ড. শামসুজ্জোহা যে আত্মত্যাগ করেছিলেন, তা এ দেশের ইতিহাসে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারী প্রাণ দিয়ে এই মাটিকে স্বাধীন করেছিলেন। ক্যাম্পাসের ‘সাবাস বাংলাদেশ’ ভাস্কর্য, শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সেই অমর শহীদদের বীরত্বগাথা প্রতিদিন স্মরণ করিয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য কর্মসূচির আয়োজন করেছে। সকালের সূচনালগ্নে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর বেলুন, ফেস্টুন ও পায়রা উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বের করা হয় এক বিশাল শোভাযাত্রা, যা পুরো ক্যাম্পাসকে এক আনন্দঘন মিলনমেলায় পরিণত করে। এরপর বৃক্ষরোপণ, সিনেট ভবনে আলোচনা সভা, বিকেলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং সন্ধ্যায় কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি উদযাপিত হয়েছে। প্রতিটি কর্মসূচিতেই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, যা তাদের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ফুটে উঠেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উপাচার্য গবেষণার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। শিক্ষার্থীদের থিসিস পর্যায় থেকেই আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা তরুণ গবেষকদের জন্য এক বিশাল প্রেরণা। উপাচার্যের লক্ষ্য হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক মানের শীর্ষস্থানীয় একটি গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রয়াসের আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আজ কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি হাজারো তরুণের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার ধারক। শত চড়াই-উৎরাই পেরিয়েও এটি তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন শাখায় পদচারণা করে এবং গবেষণায় উৎকর্ষ সাধন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি ভবিষ্যতে আরও উচ্চ শিখরে পৌঁছাবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর। আগামী দিনগুলোতে এই বিদ্যাপীঠ তার গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে অসাম্প্রদায়িক, মুক্তচিন্তার এবং মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তুলবে, এটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৪ বছর পূর্তিতে সবার একান্ত চাওয়া। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালয় হোক নতুন প্রজন্মের জ্ঞান অর্জনের উজ্জ্বল নক্ষত্র।