কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক যেন প্রতিদিন মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এই মহাসড়কে সংঘটিত দুটি পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় একজন নারীসহ মোট দুইজন প্রাণ হারিয়েছেন। সেই সঙ্গে আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন যাত্রী। সকালের শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই শোকের ছায়ায় ঢেকে যায় যখন একের পর এক দুর্ঘটনার সংবাদ ভেসে আসতে থাকে। সড়কে প্রাণহানির এমন করুণ চিত্র আবারও যাত্রী সাধারণ ও সচেতন মহলকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং যানবাহন চালনায় অবহেলার যে ভয়াবহ রূপ প্রতিদিন ফুটে উঠছে, এই দুর্ঘটনাগুলো তার আরও একটি নির্মম প্রমাণ।

মঙ্গলবার ভোরের আলো ফোটার আগেই প্রথম দুর্ঘটনাটি ঘটে। ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে কুমিল্লা-নোয়াখালী সড়কের বিপুলাসার বাজারের অদূরে কাঁচি নামক স্থানে ঢাকাগামী নীলাচল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মহাসড়কের পাশে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিকল ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয় বাসটি। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই প্রকট ছিল যে বাসটির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলেই বাসের ভেতর থাকা যাত্রীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। খবর পেয়ে স্থানীয় লোকজন ছুটে আসেন এবং আহতদের উদ্ধারে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালান। গুরুতর আহতদের নাথেরপেটুয়া জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক মো. মোস্তফা কামালকে মৃত ঘোষণা করেন। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কাছিহাটা গ্রামের মৃত ননী মিয়ার ছেলে মোস্তফা কামালের মৃত্যুতে তার পরিবারের ওপর নেমে এসেছে শোকের অমানিশা।

এই দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে একই মহাসড়কের খিলা বাজার এলাকায় ঘটে দ্বিতীয় হৃদয়বিদারক ঘটনাটি। এবার প্রাণ হারান তাসলিমা আক্তার নামে ৪২ বছর বয়সী এক নারী। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাস্তা পার হওয়ার সময় ঢাকাগামী হিমাচল পরিবহন নামে অপর একটি যাত্রীবাহী বাস তাকে চাপা দিয়ে দ্রুত গতিতে চলে যায়। তাসলিমা আক্তার কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার মৈশাতুয়া ইউনিয়নের খানাতুয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি নাঙ্গলকোট ইসলামী ব্যাংক শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবু জাফরের স্ত্রী। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করার আগেই ঘটনাস্থলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আত্মীয়-স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের সৃষ্টি হয়।

লাকসাম হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ওসমান গনি উভয় দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং বাস ও ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। ভোরের দুর্ঘটনায় আহত ১৫ জনের মধ্যে গুরুতর আহত সাতজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য লাকসাম ও কুমিল্লার বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নিহত মোস্তফা কামালের মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে তাসলিমা আক্তারের মরদেহ ঘটনাস্থল থেকে স্বজনরা তাৎক্ষণিক নিয়ে যাওয়ায় পুলিশি আইনি প্রক্রিয়ার আগেই তারা মরদেহ নিয়ে যান বলে ওসি জানান।

মহাসড়কে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, চালকদের অদক্ষতা, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে গাড়ি পার্কিং করার প্রবণতাই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। বিপুলাসার বাজারে বিকল ট্রাকটি দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে থাকলেও তা সরানোর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যার পরিণতিতে এই ভয়াবহ প্রাণহানি। একই সঙ্গে খিলা বাজারের মতো জনবহুল এলাকায় বাসগুলোর বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। যাত্রী এবং পথচারীরা প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে এই মহাসড়ক ব্যবহার করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি এবং মহাসড়ক আইন বাস্তবায়নে ঘাটতি থাকায় চালকরা আইন তোয়াক্কা না করে গাড়ি চালান।

সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই ঘটনাগুলো আবারও নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যানবাহন ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক ব্যবস্থার সক্ষমতাকে। প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অনেকগুলো পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আবু জাফরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তারের অকাল মৃত্যু এবং মোস্তফা কামালের চলে যাওয়া যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে, তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত হবে এসব ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে অপরাধী চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। শুধুমাত্র মামলা বা গাড়ি জব্দ করাই যথেষ্ট নয়, বরং মহাসড়কে নিয়মভঙ্গকারীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা জরুরি।

দুর্ঘটনার পর মহাসড়কের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা কাজ করলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কমছে না। প্রতিদিন বাড়ছে মৃত্যু মিছিল, কিন্তু থামছে না বেপরোয়া গতি। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবেই। প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই তদন্ত কমিটি বা আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলা হলেও তার সুফল কতটুকু আসে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সড়ক পরিবহন আইনকে আরও বেশি শক্তিশালী এবং তার বাস্তবায়নকে স্বচ্ছ করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারসহ স্থানীয় সচেতন মহল।

“একটি বাংলাদেশ অনলাইন” সবসময় নিরাপদ সড়কের পক্ষে সোচ্চার। আমাদের প্রত্যাশা, স্থানীয় প্রশাসন এবং হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে এই মহাসড়কটি নিরাপদ হবে এবং আর কোনো পরিবারকে এমন অকাল শোকে নীল হতে হবে না। মহাসড়কের প্রতিটি পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত টহল, গতিসীমা নির্ধারণ এবং অবৈধ পার্কিং বিরোধী অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছে “একটি বাংলাদেশ অনলাইন”। মহাসড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপই হতে পারে এমন দুর্ঘটনার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত