স্বাস্থ্য খাতের অবহেলা নিয়ে ডা. জুবাইদার উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
স্বাস্থ্য খাতের অবহেলা নিয়ে ডা. জুবাইদার উদ্বেগ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘ সময় ধরে যে কাঠামোগত অবহেলা, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার চরম সংকটের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানের একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতের রূপান্তর’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি স্বাস্থ্যসেবার এই করুণ চিত্রের ওপর আলোকপাত করেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি তুলে ধরেন যে, কীভাবে বছরের পর বছর সঠিক পরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার অভাবে দেশের সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও সমস্যার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডা. জুবাইদা রহমান তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের একজন নাগরিককে তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রায় ৭২ শতাংশই নিজের পকেট থেকে বহন করতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, যখন কোনো দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে জনগণের ব্যক্তিগত খরচের হার এত উঁচুতে পৌঁছায়, তখন সেটি আর স্বাস্থ্যসেবা থাকে না, বরং তা দারিদ্র্যের এক ভয়ানক ফাঁদে পরিণত হয়। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, অসুস্থতা আজ বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কেবল শারীরিক কষ্টের কারণ নয়, বরং এটি দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের লাখ লাখ পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে এবং ঋণের চক্রে আটকা পড়ছে, যা একটি আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর উপস্থিতিতেই ডা. জুবাইদা রহমান বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অসংগতিগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যসেবা শুধু সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভর করে না, বরং সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে যে জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিয়েছে, তার ফল ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ রোগীকে। তিনি নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখন সময় এসেছে এই খাতের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আনার এবং প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য সেবার দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়ার।

অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের ভয়াবহতা নিয়েও তিনি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক ব্যাধি এখন মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের অভাবের কারণে দেশের মানুষ অকালেই বার্ধক্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব রোগের প্রাদুর্ভাব আগামী দিনে দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন যে, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় সরকারকে বেশি বিনিয়োগ করতে হবে এবং জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরির জন্য একটি জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণা চালাতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কীভাবে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে নতুন নতুন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে এবং মানুষের জীবনধারা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। দ্রুত নগরায়নের ফলে মানুষের জীবনযাপন ও সেবা গ্রহণের পদ্ধতি বদলে গেছে, যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তিনি বলেন, আধুনিক নগরায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন, যাতে শহরের ভিড় কমিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পৌঁছে দেওয়া যায়।

ডা. জুবাইদা রহমানের এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতের রূপান্তর কেবল আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিটি সাধারণ মানুষের জন্য ন্যূনতম স্বাস্থ্য ব্যয় নিশ্চিত করা এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেবার মান বৃদ্ধি করা। সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি তিনি ওষুধের আকাশচুম্বী দাম নিয়ন্ত্রণে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, ওষুধের বাজার যদি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তবে কোনো চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনই একজন গরিব মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবে না।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, স্বাস্থ্য বাজেট যেন কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং এই বরাদ্দের প্রতিটি টাকা যেন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতে ব্যয় করা হয়। তিনি স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কেবল ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ দিলেই হবে না, তাদের মাঠ পর্যায়ে সেবা দেওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা পেশার মানুষদের সেবার মানসিকতা নিয়ে রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি আহ্বান জানান, যাতে হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্ক নয়, বরং আশ্রয়ের জায়গা হয়ে ওঠে।

ডা. জুবাইদা রহমানের এই সাহসী ও যৌক্তিক পর্যবেক্ষণ দেশের স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারণী মহলে নতুন করে চিন্তার খোরাক জোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি যে বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরেছেন, তা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি পর্যায়ে ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন। একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনের বিকল্প নেই, আর তার প্রথম শর্তই হলো মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন ডা. জুবাইদা রহমানের এই আহ্বানকে স্বাগত জানায় এবং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যুগান্তকারী রূপান্তরের অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে চিকিৎসা আর কারো জন্য দারিদ্র্যের কারণ হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত