প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বশান্তি রক্ষায় দীর্ঘ সময় ধরে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে বাংলাদেশ। সেই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ কন্টিনজেন্টগুলোর সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং হাইতির মতো জটিল সংকটময় এলাকায় শান্তি ফেরাতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্টের (ডিওএস) আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি এসব প্রস্তাবনা পেশ করেন। এই বৈঠকটি কেবল একটি কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের নতুন করে প্রস্তুতির একটি বার্তাও ছিল।
বৈঠকের শুরুতেই সালাহউদ্দিন আহমদ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশি সদস্যদের প্রাপ্য প্রতিপূরণ বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজতর করার ক্ষেত্রে ডিওএস-এর ধারাবাহিক সহায়তার জন্য আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেলকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, বৈশ্বিক শান্তি রক্ষার কঠিন দায়িত্ব পালনে আমাদের সেনা ও পুলিশ সদস্যরা যে ত্যাগ স্বীকার করেন, তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট ও আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এছাড়া মিশন এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষায় ডিওএস-এর পরিবেশ বিভাগের নেওয়া উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোতে কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা পরিবেশগত ক্ষতি হ্রাস করতে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পরিবেশবান্ধব শান্তিরক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে বিশ্বজুড়ে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করছে, তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বিশ্ব ইতিহাসে প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই শান্তিরক্ষা মিশনে সৌর প্যানেল স্থাপনের মডেল তৈরি করেছে। এই বিশেষায়িত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে ভবিষ্যতে মিশনের প্রতিটি এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেন তিনি। মিশন এলাকাগুলোকে শুধু নিরাপত্তা বলয় হিসেবে নয়, বরং একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব আবাসস্থল হিসেবে গড়ে তোলার এই পরিকল্পনা বিশ্বনেতাদের নজর কেড়েছে। অতুল খারেও বাংলাদেশের এই অগ্রণী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশকে জাতিসংঘের দীর্ঘমেয়াদী সহযোগী হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
নারীর ক্ষমতায়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি’ (ডব্লিউ পিএস) এজেন্ডা বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জাতিসংঘকে উদ্দেশ্য করে বলেন, মিশনগুলোতে নারী শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতি বাড়ছে, কিন্তু তাদের কাজের জন্য উপযোগী নিরাপদ কর্মপরিবেশ এখনো প্রত্যাশিত মানে পৌঁছায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘকে আহ্বান জানান যেন মিশন এলাকায় নারী-বান্ধব ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়। তার মতে, একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ কেবল নারীর অংশগ্রহণই বাড়াবে না, বরং সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও আস্থার সম্পর্ক স্থাপনেও তা বিশাল ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল হাইতির বর্তমান জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি। হাইতিতে শান্তি ফেরাতে বাংলাদেশ পুলিশ তাদের তিনটি আধুনিক ও বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। প্রচলিত পুলিশ ইউনিটের তুলনায় এই ইউনিটগুলো অনেক বেশি কার্যকর এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন। সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এই ইউনিটগুলো কেবল সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজই করবে না, বরং সোয়াত, র্যাপিড রেসপন্স প্ল্যাটুন, বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ, ফরেনসিক ও ক্রাইম সিন ম্যানেজমেন্ট, সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা এবং সাইবার ক্রাইম তদন্তের মতো আধুনিক ও স্পর্শকাতর বিষয়ে বিশেষভাবে পারদর্শী। এছাড়া জলপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌ-কার্যক্রম এবং মাদকবিরোধী অভিযানেও তারা দক্ষতার পরিচয় দিতে সক্ষম।
হাইতির মতো প্রতিকূল ও আক্রমণাত্মক পরিস্থিতিতে কাজ করার জন্য আমাদের শান্তিরক্ষীদের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর মন্ত্রী জোর দেন। তিনি দাবি করেন, আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামের পাশাপাশি শান্তিরক্ষীদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি, যা তাদের জীবনের ঝুঁকি কমিয়ে কার্যকারিতা বাড়াবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী ১৫ থেকে ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশ পুলিশের একটি তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বিস্তারিত আলোচনার জন্য অংশ নেবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের এই বিশেষায়িত প্রস্তাবনা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তারা সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশি সদস্যদের অতুলনীয় পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা এবং শৃঙ্খলার প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য শক্তির নাম। হাইতিতে বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট মোতায়েনের বিষয়ে তিনি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আলোচনার আশ্বাস দেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এই সাহসী পদযাত্রা এবং শান্তি রক্ষার প্রতিটি পর্যায়ে আধুনিকায়নের প্রচেষ্টা বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ ও বাংলাদেশের এই অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে আরও মজবুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের এই সক্ষমতা বৃদ্ধি কেবল আমাদের দেশের মর্যাদা বাড়াবে না, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মাঝে এক নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দেবে।