প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং আইনি জটিলতার বেড়াজাল ছিন্ন করে অবশেষে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি অনুষদে স্থায়ীভাবে ডিন নিয়োগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে এক নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিশেষ কমিটির বিশদ পর্যালোচনা, দায়েরকৃত সিভিল পিটিশনের আইনি বিশ্লেষণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টার সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ নূরুল করিম চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে এই নিয়োগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের তালিকায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট অনুষদগুলোর জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদগণ। বিজ্ঞান অনুষদে ডিন হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সজল চন্দ্র মজুমদার, কলা ও মানবিক অনুষদে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শামসুজ্জামান মিলকী এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজাউল করিম। এছাড়াও প্রকৌশল অনুষদের নতুন ডিন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহমুদুল হাছান এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এমদাদুল হক। অফিস আদেশের নির্দেশনা অনুযায়ী, নিয়োগের তারিখ থেকে পরবর্তী দুই বছর তারা স্ব স্ব অনুষদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক নেতৃত্ব প্রদান করবেন। এর আগে গত ১৮ মে আইন অনুষদের ডিন হিসেবে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক বেলাল উদ্দিনকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের ডিন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখা হয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সময় অনুষদগুলোতে ডিন নিয়োগের ক্ষেত্রে পালাক্রম বা রোটেশন নীতির ব্যত্যয় ঘটায় যে অসন্তোষ ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে এবার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব বিভাগ দীর্ঘসময় ডিনশিপের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, এবার সেখান থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। জ্যেষ্ঠতার নীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি এটিও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, অতীতে যারা ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অথবা যাদের নিয়ে কোনো আইনি বিতর্ক রয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে পরবর্তী যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন সুদূরপ্রসারী ও নিরপেক্ষ উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমে বিতর্কের কোনো অবকাশ থাকবে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ইতিহাসে ডিন নিয়োগের ঘটনাটি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। গত ১১ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক হায়দার আলীর প্রশাসনের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তীকালীন ডিন নিয়োগের গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। নিয়োগের সেই প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং প্রশাসনের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি যোগদানের মাত্র দুই কর্মদিবসের মধ্যেই বিতর্কিত সেই নিয়োগ বাতিল করেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজের কাছে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০ মে পাঁচটি অনুষদে অন্তর্বর্তীকালীনভাবে ডিনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সে সময় বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপক মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপক জাকির ছায়াদউল্লাহ খান, প্রকৌশল অনুষদে অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদে অধ্যাপক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকারকে উপাচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, আইন উপদেষ্টার আইনি মতামত পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা অন্তর্বর্তীকালীন এই দায়িত্ব পালন করবেন। দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনা শেষে অবশেষে স্থায়ী নিয়োগের মাধ্যমে সেই অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থার অবসান হলো এবং বিশ্ববিদ্যালয় একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামোয় ফিরে এলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও একাডেমিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ডিনদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাঁচটি অনুষদে স্থায়ী ডিন নিয়োগের ফলে এখন থেকে প্রতিটি অনুষদের একাডেমিক কার্যক্রম, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা পরিকল্পনা আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মনে করছেন, নিয়মিত ও স্থায়ী নেতৃত্বের ফলে প্রশাসনিক কাজে যে স্থবিরতা ছিল, তা দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা আইনি জটিলতা নিরসনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে, তা শিক্ষাঙ্গনের জন্য একটি ইতিবাচক মাইলফলক।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজর মূলত মানসম্মত শিক্ষার প্রসার ও গবেষণামূলক কার্যক্রমের দিকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাজেট অনুমোদনসহ প্রশাসনিক সব জটিলতা কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ৮৩ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদনের পর এই ডিন নিয়োগের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। শিক্ষকরা এখন তাদের গবেষণায় অধিক মনোযোগী হতে পারবেন এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে এক স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ গড়ে উঠবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সঙ্গী হিসেবে সবসময় পাশে থাকবে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই উদ্যোগের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছে।