প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্যের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও, জাতীয় সংসদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে নিজেদের গুছিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। বর্তমান সংসদের বাজেট অধিবেশনসহ সামগ্রিক কার্যক্রমে সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দৃশ্যমান হয়েছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মাঝে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সুদীর্ঘ রীতি ও রেওয়াজগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে সরকারি দলের এমপিদের অনীহা এবং মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি সংসদীয় কার্যক্রমকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রাণহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
সংসদীয় কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাজেট আলোচনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনেও সরকারি দলের বেশিরভাগ সংসদ সদস্যের বাজেট সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতির অভাব রয়েছে। বাজেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরিবর্তে দলীয় নেতৃত্বের তোষামোদ বা ব্যক্তিগত বয়ানে সময় নষ্ট করার প্রবণতা সাধারণ মানুষকে হতাশ করেছে। অনেক সদস্যকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাজেট নিয়ে কথা বলতে বললে তারা তা এড়িয়ে গেছেন, যা সংসদীয় বিতর্কের মানকে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে গঠনমূলক আলোচনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হলো আইনসভার প্রধান লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণে সরকারি দলের সিংহভাগ সদস্যের নিষ্প্রভ ভূমিকা সংসদীয় কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা নিয়ে এসেছে।
সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি এখন এক নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সংসদে উপস্থিত থাকার বিষয়ে এক ধরনের অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিরোধী দলের সদস্যরা বারবার বিষয়টি উত্থাপন করলেও অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ একাধিকবার মন্ত্রীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানালেও তা অনেকটা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাজেট আলোচনার মতো সংবেদনশীল সময়েও অর্থমন্ত্রী ছাড়া অন্য মন্ত্রীদের উপস্থিতি নামমাত্র। সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের এমন আচরণ সংসদীয় কার্যক্রমে গুরুত্বের অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অসংগতি দেখা দিয়েছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংসদীয় ইতিহাসে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে না রাখার যে অলিখিত রেওয়াজ ছিল, তা ভেঙে এবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা একে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখছেন। নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার যে মূল হাতিয়ার সংসদীয় কমিটি, সেখানে মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি সেই জবাবদিহিতার পথকে কতটা সংকীর্ণ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কমিটি গঠনে ধীরগতি এবং প্রচলিত রীতিনীতি উপেক্ষা করার এই প্রবণতা বিএনপির নতুন নেতৃত্ব ও প্রশাসনের দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমন্বয়হীনতার আরও একটি প্রকট রূপ দেখা গেছে দলীয় হুইপদের কর্মকাণ্ডে। একাধিক এমপি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তাদের বক্তৃতার তালিকা বা নামের ক্রম নিয়ে সঠিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। অনেক সময় তালিকাভুক্ত বক্তারা জানেনই না তারা কখন বক্তৃতা দেবেন, আবার অনেক সময় তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও তারা বক্তৃতা দিতে পারছেন না। হুইপ জি কে গউছ বিষয়টিকে নতুন সংসদ সদস্য হওয়ার কারণে সমন্বয়হীনতা বলে দাবি করলেও, সচেতন মহলে তা সরকার পরিচালনা ও সংসদীয় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির ফলে দলের অনেক অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যও অস্বস্তির মুখে পড়ছেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা প্রকাশ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মতো জাতীয় ইস্যুগুলোতেও সরকারি দলের অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট বিভ্রান্তি ও মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। একদিকে শীর্ষ নেতৃত্ব সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে দলেরই অনেক এমপি সংসদে বিষয়টিকে ‘অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক’ বা ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে সৃষ্ট উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই বিভিন্ন সদস্যের ভিন্নমুখী বক্তব্য সরকারকে বারবার রক্ষণাত্মক অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে। এই অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাব বিরোধী দলকে সংসদে আক্রমণের সুযোগ করে দিচ্ছে, যা সরকারদলীয় হুইপ বা জ্যেষ্ঠ নেতাদের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন করে তুলছে।
সংসদীয় বিধিবিধান ও শিষ্টাচারের বিষয়টিও বারবার বিতর্কের মুখে পড়ছে। নারী এমপিদের পোশাক নিয়ে মন্তব্য করা বা পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থের অপব্যাখ্যার মতো ঘটনাগুলো সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে। এসব ইস্যুতে বিরোধী দলের ওয়াকআউট বা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় সংসদের স্বাভাবিক পরিবেশকে নষ্ট করছে। আইনসভা যখন বিতর্কের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খোঁজার জায়গা, তখন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অসংলগ্ন মন্তব্য সেই পরিবেশকে কলঙ্কিত করছে। বিল পাসের ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং বিলের কপি যথাসময়ে সরবরাহ না করার অভিযোগ সংসদীয় রীতির ব্যত্যয় হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের মতে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির জন্য যেমন বড় সুযোগ, তেমনি এটি সতর্কতারও বিষয়। এই বিশাল সমর্থনকে যদি সঠিকভাবে ব্যবহার না করা হয়, তবে ছোট ছোট ভুলগুলোই বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা বা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো জাতীয় দাবিগুলোর ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংসদীয় কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ও সমন্বয় ফিরিয়ে আনতে না পারলে সরকারি দল বিএনপির জন্য আগামী দিনগুলো বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সদস্যদের সংসদীয় জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা চলছে ঠিকই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে এর প্রভাব কতটুকু দৃশ্যমান হবে, তা সময়সাপেক্ষ। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই সংসদীয় পরিস্থিতির প্রতিটি খুঁটিনাটি পরিবর্তনের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।