প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। মঙ্গলবার কলকাতার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটিতে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন কিছু ঐতিহাসিক প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন, যা ভারতের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে সামনে নিয়ে এসেছে। মোদির মুখে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘কংগ্রেস দেশকে ভাগ করেছিল, আমি পাকিস্তানকে ভাগ করেছি’—অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে এক ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশভাগের সেই উত্তাল সময়ের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে যখন ভারতবর্ষের মানচিত্র পুনর্গঠিত হচ্ছিল, তখন গোটা বাংলাকে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি গভীর চক্রান্ত দানা বেঁধেছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যেভাবে অনড় অবস্থানে থেকে বাংলা ও বঙ্গবাসীকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকিয়ে রাখার লড়াই করেছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মোদির মতে, শ্যামাপ্রসাদের সেই সাহসী পদক্ষেপ না থাকলে অখণ্ডিত ভারতের যে চিত্র আমরা আজ দেখি, তা হয়তো ভিন্ন হতে পারত। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েই তিনি কংগ্রেসের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার সেই অকুতোভয় দাবি তুলেছিলেন, যা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবন ও আদর্শের ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, তৎকালীন কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগে ভিন্নমত পোষণ করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের বীজ রোপণ করেছিলেন। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, বরং ছিলেন এমন এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, যিনি জাতীয় স্বার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেননি। মোদি আরও জোর দিয়ে বলেন, আজকের বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির যে আদর্শিক ভিত্তি, তা মূলত শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জনসংঘের দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর আদর্শের পথ ধরেই ভারত আজ উন্নতির পথে এগিয়ে চলেছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদির ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ এবং রাজ্য সরকারকে এই বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য অভিনন্দন জানানো রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত দুই বছর ধরে সমগ্র ভারতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে এই মহান নেতার দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে গত ২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালনের বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেন। মোদির মতে, জাতীয় বীরদের স্মরণ করার এই প্রবণতা কেবল ঐতিহ্যের অংশ নয়, বরং এটি দেশপ্রেমের এক নতুন জাগরণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের এই ঐতিহাসিক উক্তি পুনরায় উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মূলত ভারতের স্বাধীনতার সময়ের সেই রাজনৈতিক বিভাজন ও আদর্শিক সংঘাতকে পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। দেশভাগের ক্ষত এবং সেই সংকটের সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার বিষয়টি ভারতীয় ইতিহাসে বরাবরই সংবেদনশীল। মোদির বক্তব্যের মাধ্যমে একদিকে যেমন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মত্যাগ ও দূরদর্শিতাকে সম্মান জানানো হয়েছে, তেমনি কংগ্রেসের তৎকালীন নেতৃত্বের সমালোচনাকে পুনরায় জীবন্ত করা হয়েছে। এই বার্তাটি বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিজেপির মতাদর্শিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার একটি কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ইচ্ছাশক্তি, স্পষ্ট উদ্দেশ্য এবং অটল সংকল্প আজও দেশের তরুণ প্রজন্মকে পথ দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, একজন প্রকৃত নেতা তিনি যিনি সংকটের সময় মাথা নত করেন না, বরং ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জাতীয়তাবাদের যে ধারণা লালন করেছিলেন, তা ভারতীয়দের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়েই মোদির এই ভার্চুয়াল ভাষণ প্রমাণ করে যে, আজও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শ ভারতীয় রাজনীতির মূল ধারায় কতটা প্রভাব বিস্তার করে আছে।
অনুষ্ঠান শেষে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির এই মিথস্ক্রিয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষণে নতুন মোড় নিয়েছে। জাতীয় বীরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশীয় ঐক্য ও অখণ্ডতার সুরটি আরও জোরালো করার এই প্রয়াস সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের এই আয়োজন কেবল কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং ভারতের সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের প্রতি এক সম্মিলিত শ্রদ্ধাঞ্জলি। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দর্শন নিয়ে চলমান এই বিতর্কের দিকে নিবিড় নজর রাখছে, যা আগামী দিনগুলোতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।