প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম স্থিতিশীল বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত জাতীয় সঞ্চয়পত্র স্কিমগুলোর মুনাফার হার নিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সরকার বড় ধরনের কোনো পরিবর্তনের পথে হাঁটেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক বিশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে জানিয়েছে যে, জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোর বিদ্যমান মুনাফার হার আগামী জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদেও অপরিবর্তিত থাকবে। এই সিদ্ধান্তটি মূলত ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে, যার ফলে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারী সাধারণ মানুষ এবং অবসরভোগীরা আগের মতোই তাদের মুনাফা পাওয়ার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক জারিকৃত এই নির্দেশনাটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে পাঠানো হয়েছে, যাতে তারা তাদের গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের গত ২ জুলাই জারি করা একটি প্রজ্ঞাপনের আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, জানুয়ারি-জুন ২০২৬ মেয়াদে সঞ্চয়পত্রের যে মুনাফার হার কার্যকর ছিল, তা আগামী ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত একই শর্তে বহাল থাকবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নিয়ে সরকার নতুন করে কোনো জটিলতায় যাচ্ছে না। তার সেই বক্তব্যের প্রতিফলনই এখন প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনায় স্পষ্ট হয়ে উঠল। সাধারণত প্রতি ছয় মাস অন্তর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পর্যালোচনা করার নিয়ম থাকলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকার বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার অপরিবর্তিত থাকার সংবাদটি বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বস্তিদায়ক। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুনাফার হার কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। তবে সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আগের হার বহাল রাখায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অটুট রয়েছে। বর্তমান নিয়মানুযায়ী, স্কিমভেদে সঞ্চয়পত্রের সর্বোচ্চ মুনাফার হার ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে, যা বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করছে।
বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে সঞ্চয়পত্রকে মূলত দুটি স্তরে বিন্যাস করা হয়েছে। প্রথম স্তরে রয়েছেন তারা, যারা সর্বমোট ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচে বিনিয়োগ করেন এবং দ্বিতীয় স্তরে রয়েছেন সেই সব বিনিয়োগকারী, যারা এর চেয়ে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনিয়োগ মাধ্যম ‘পরিবার সঞ্চয়পত্র’-এর ক্ষেত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা মেয়াদ পূর্তির আগে নগদায়ন করলে পঞ্চম বছরে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ মুনাফা পাবেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা একই মেয়াদে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ মুনাফা পাবেন। পরিবার সঞ্চয়পত্র মূলত অবসরপ্রাপ্ত নারী ও বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করে, যারা নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ বিনিয়োগের সন্ধানে থাকেন।
বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রেও মুনাফার হারের এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই সঞ্চয়পত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা পঞ্চম বছরে ১১ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ হারে মুনাফা অর্জন করতে পারবেন। একইভাবে ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ মুনাফা পাচ্ছেন। পেনশনভোগীদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারেও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। এখানেও প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা পঞ্চম বছরে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ মুনাফা পাবেন, যা এই শ্রেণির মানুষের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখছে।
ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক মেয়াদি হিসাবের ক্ষেত্রেও মুনাফার এই একই হার বহাল রাখা হয়েছে। প্রথম ধাপের বিনিয়োগকারীরা তৃতীয় বছরে ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপের বিনিয়োগকারীরা ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ মুনাফা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। মুনাফার এই হারগুলো মূলত বিনিয়োগের পরিমাণ ও মেয়াদের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। সরকার চায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা যাতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে তাদের জীবনের শেষ বয়সে আর্থিক কোনো সংকটে না পড়েন। এই বিনিয়োগ মাধ্যমের ওপর মানুষের যে গভীর আস্থা রয়েছে, তা মুনাফার হার স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমেই আরও সুদৃঢ় হলো।
তবে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে মাঝেমধ্যেই কর বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর বারবার স্পষ্ট করেছে যে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর আয়কর প্রদান একটি বিধিবদ্ধ নিয়ম এবং তা বিনিয়োগের অংকের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। করের হিসাব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যেন কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেজন্য ব্যাংকগুলোকে তাদের গ্রাহক সেবা কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত তথ্যের যোগান দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার বিনিয়োগকারীদের মুনাফার সুরক্ষা দিতে বদ্ধপরিকর, তবে সেই সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব নীতি অনুযায়ী কর প্রদানের বিষয়টিও স্বচ্ছ রাখা হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান সরকারের এই সিদ্ধান্তটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার পরিবেশ তৈরি করেছে। মুদ্রাস্ফীতির এই কঠিন সময়ে যখন ব্যাংকিং খাতের সুদের হার প্রতিনিয়ত উঠানামা করছে, তখন সঞ্চয়পত্রের মতো একটি স্থিতিশীল মাধ্যম সাধারণ মানুষের জীবনের বড় ভরসার জায়গা। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ছয় মাস পর্যন্ত এই হার অপরিবর্তিত থাকবে, যা বিনিয়োগকারীদের আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়তা করবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন দেশের সকল স্তরের বিনিয়োগকারীদের জন্য সঞ্চয়পত্রের সর্বশেষ তথ্য নিয়মিত পৌঁছে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যারা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী বা বর্তমানে বিনিয়োগ করে রেখেছেন, তারা এই স্থিতিশীলতার সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন।