টাঙ্গাইলে গণধর্ষণ: তিন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ২ বার
টাঙ্গাইলে গণধর্ষণ: তিন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় থাকা এক ভুক্তভোগী নারীর দীর্ঘ তিন বছরের লড়াইয়ের অবসান ঘটল আজ। টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক ও জেলা জজ আ.ন.ম. ইলিয়াস চাঞ্চল্যকর এক ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে অপহরণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অপরাধে তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এই রায়টি কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার প্রতি এক শক্তিশালী বার্তা। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির এই রায় টাঙ্গাইলসহ সারা দেশের মানুষের মধ্যে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২২ জুন এক ঘৃণ্য ঘটনার সূত্রপাত হয়। জামালপুর থেকে আসা ভুক্তভোগী ওই নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে টাঙ্গাইলের মধুপুরে নিয়ে আসে আ. রহিম নামে এক ব্যক্তি। রহিম ছিল এই অপহরণ ও পাশবিকতার মূল হোতা। ভুক্তভোগীকে পাত্রী দেখানোর নাম করে মধুপুরের দুখোলা বনাঞ্চলের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বনাঞ্চলের সেই নিরিবিলি পরিবেশে পৌঁছানোর পরপরই অপরাধীদের আসল রূপ বেরিয়ে আসে। প্রধান আসামি রহিম প্রথমে ভুক্তভোগীকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন রেখে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং পরবর্তীতে তার দুই সহযোগী শফিকুল ইসলাম শফি ও সামছুল হক সামছুকে নিয়ে ওই নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। এই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ছিল অমানবিক এবং নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত পর্যায়।

ঘটনাটি ঘটার পর ভুক্তভোগী নারী নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাহস সঞ্চয় করে মধুপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মামলাটি তদন্ত করে এবং পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য সংগ্রহ করে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন আদালতে ভুক্তভোগী নারী নিজের ওপর ঘটা সেই লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু তার অটল দৃঢ়তা এবং রাষ্ট্রপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের বলিষ্ঠ যুক্তিতর্কের কাছে অপরাধীরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আদালতে উপস্থিত থাকা আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, আসামিদের অপরাধ ছিল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত।

রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রধান আসামি আ. রহিমকে অপহরণের দায়ে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা প্রদান করেন। এছাড়া সংঘবদ্ধ ধর্ষণের দায়ে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অপর দুই আসামি শফিকুল ইসলাম শফি ও সামছুল হক সামছুকেও আইনের ৯(৩) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আসামিদের আরও অতিরিক্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। রায় ঘোষণার পরপরই কড়া নিরাপত্তায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. ওমরাও খান দিলু এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজ থেকে এ জাতীয় জঘন্য অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব। বিচারপ্রার্থী নারীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই রায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অন্যদিকে আসামিপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট মো. শাহানশাহ সিদ্দিকী মিন্টু। রায় ঘোষণার পর টাঙ্গাইলের সচেতন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এবং নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এ ধরনের বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকা জরুরি।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারীর নিরাপত্তা বর্তমানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিয়ের প্রলোভন বা যেকোনো কৌশলে নারীকে ভুল পথে নিয়ে গিয়ে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর ঘটনা মাঝেমধ্যেই সংবাদপত্রের শিরোনাম হচ্ছে। টাঙ্গাইলের এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধবিশ্বাস বা প্রলোভনের ফাঁদ থেকে সাবধান থাকা প্রতিটি নারীর জন্য জরুরি। পাশাপাশি অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের সামাজিক পারিপার্শ্বিকতাও বিচার বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আইন তার আপন গতিতে চলবে ঠিকই, কিন্তু অপরাধী তৈরি হওয়ার আগেই যদি সমাজ সচেতন হয়, তবেই কেবল এ জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন সর্বদা নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার পক্ষে সোচ্চার। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দ্রুত নিষ্পত্তি সমাজে অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করতে পারে। টাঙ্গাইলের এই মামলার রায় কেবল দণ্ডিত তিন অপরাধীর সাজা নয়, বরং এটি সেই সকল মানুষের জয় যারা নারীর অধিকার ও সুরক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে। মামলাটি দায়ের থেকে রায় পাওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগী যে ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তা অন্যান্য ভুক্তভোগীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সমাজ থেকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে প্রশাসনের পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত