দক্ষিণ ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল, ঘরছাড়া ১০ হাজার মানুষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৪০ বার
দক্ষিণ ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানল, ঘরছাড়া ১০ হাজার মানুষ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউরোপের বুকে ফের প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি। দক্ষিণ ফ্রান্সের পাহাড়ি এলাকাগুলো এখন লেলিহান শিখার গ্রাসে। স্পেন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত প্রায় দুই ডজন ছোট শহর ও গ্রাম থেকে অন্তত দশ হাজার মানুষকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রকৃতির এই ভয়াবহ বিপর্যয় কেবল মানুষের ঘরবাড়িই কেড়ে নেয়নি, বরং বনাঞ্চল ও সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকার এক বিশাল অংশকে ছাইয়ে পরিণত করেছে। ফরাসি পিরেনিজ পর্বতমালার পাদদেশে ত্রেভিয়াক এলাকায় প্রায় ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি আগুনের তাণ্ডবে পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতিকে ফ্রান্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দমকল বাহিনীর সদস্যরা জীবন বাজি রেখে আগুন নিয়ন্ত্রণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান পিয়ের রেনো দ্য লা মোত জানিয়েছেন যে, এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজন দমকলকর্মী রয়েছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং জোরালো বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। বাতাস আগুনের শিখাকে অতি দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই সংকটের মুহূর্তে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফ্রান্সের পাশে দাঁড়িয়েছে। সাইপ্রাস ও সুইডেন থেকে চারটি বিশেষ পানি ছিটানো উড়োজাহাজ পাঠানো হয়েছে, যা আকাশ থেকে পানি বর্ষণের মাধ্যমে আগুন নেভানোর কাজ করছে। এছাড়াও ১০০ জনের বেশি প্রশিক্ষিত দমকলকর্মীকে সহায়তা করার জন্য ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন এক বার্তায় জানিয়েছেন, এই কঠিন সময়ে ইউরোপ ফ্রান্সের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছে।

দাবানলের এই ভয়াবহতা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সাইকেল প্রতিযোগিতা ‘ট্যুর দ্য ফ্রান্স’-এর ওপরও প্রভাব ফেলেছে। প্রতিযোগিতার তৃতীয় ধাপের রুটের খুব কাছ দিয়েই আগুনের শিখা অগ্রসর হচ্ছিল। নিরাপত্তার খাতিরে সোমবার ওই রুট সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, দমকল বাহিনীর কাজ সহজ করার জন্য প্রতিযোগিতার সঙ্গে থাকা বিশাল গাড়ির বহর কমিয়ে আনা হয়েছে। এই ধাপটি ছিল ১৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা স্পেনের গ্রানোলিয়ের্স শহর থেকে শুরু হয়ে ফ্রান্সের পিরেনে-ওরিয়ঁতাল অঞ্চলের লে জঁগলে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। খেলা এবং জীবন—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে আয়োজকরা এখন হিমশিম খাচ্ছেন, কারণ নিরাপত্তার বিষয়টি বর্তমানে তাদের কাছে সর্বাগ্রে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এই দুর্যোগের পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব। চলতি বছরের মে ও জুন মাসে ফ্রান্সসহ পুরো পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে যে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে, তা বনাঞ্চল ও ঘাসকে শুকিয়ে খড়কুঠার মতো করে দিয়েছে। ফলে একটি ছোট স্ফুলিঙ্গ থেকেও দাবানল সৃষ্টির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশ্ব আবহাওয়াবিদদের সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ইউরোপে বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হারে তাপমাত্রা বাড়ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঘটনা আরও ঘনঘন এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে। চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে তাপমাত্রা আবারও ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।

কেবল ফ্রান্স নয়, স্পেনের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলে প্রায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর জমি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেখানে সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকা লেস গাভারেসের প্রায় ৯৭ শতাংশই আগুনের কবলে পড়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে কাতালোনিয়ার আগুন এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবে পুলিশ দাবানল সৃষ্টির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাস্তার পাশে একটি অ্যাঙ্গেল গ্রাইন্ডার ব্যবহারের সময় কাজ থেকে সৃষ্ট স্ফুলিঙ্গ এই আগুনের সূত্রপাত করেছে। এছাড়া স্পেনের কাস্তেয়োন প্রদেশে সিয়েরা দে এস্পাদান জাতীয় উদ্যানে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি দাবানল থেকে অন্তত ৫০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পর্তুগালের অবস্থা আরও ভয়াবহ; সেখানে গত কয়েক দিনে শত শত দাবানলের ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টরের বেশি ভূমি পুড়ে গেছে, যা প্রায় চৌদ্দ হাজার ফুটবল মাঠের আয়তনের সমান।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এই মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়কে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই দাবানল কেবল ইউরোপের নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মানুষ যখন প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে, তখন প্রকৃতি তার রোষ এভাবেই প্রকাশ করে। ঘরছাড়া এই হাজার হাজার মানুষের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং তাদের দীর্ঘশ্বাস যেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা ছাড়া টেকসই পৃথিবী গড়া অসম্ভব। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি আমাদের সমবেদনা। আমরা প্রত্যাশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় দাবানল নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং বিপর্যস্ত মানুষগুলো আবারও তাদের আপন ঠিকানায় ফিরে যেতে পারবে। এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক জলবায়ু সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন বিশ্বের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com