প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আকাশ যেন আজ অশ্রু ঝরাচ্ছে। টানা তিন দিনের অবিরাম বর্ষণে জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গত ২৪ ঘণ্টায় আকাশ থেকে যে পরিমাণ জলধারা নেমেছে, তা গত কয়েক বছরের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত, যা চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের ঘটনা। মৌসুমী বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে এই অতিভারী বর্ষণ চলছে এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত এই পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতির সম্ভাবনা নেই। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তির কাছে নগরবাসী যেন আজ অসহায়।
টানা বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত তলিয়ে গেছে পানির নিচে। সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া ঝুম বৃষ্টিতে মঙ্গলবার সকালের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। কর্মজীবী মানুষ ঘর থেকে বের হয়েই পড়েছেন মহাবিপাকে। একদিকে গণপরিবহনের তীব্র সংকট, অন্যদিকে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি। জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, চকবাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, বাকলিয়া ও বহদ্দারহাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পানি থৈ থৈ করছে। নগরীর নিচু এলাকা হিসেবে পরিচিত এসব স্থানে জলাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী হলেও আজকের মতো এমন পরিস্থিতি সচরাচর দেখা যায় না। অনেক বাসাবাড়ির নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় গৃহস্থালি সামগ্রীর ব্যাপক ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বৃষ্টির কারণে সকালে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের। যানবাহন কম থাকার সুযোগ নিয়ে অটোরিকশা ও সিএনজি চালকরা যাত্রীদের কাছ থেকে দাবি করছে অতিরিক্ত ভাড়া। অক্সিজেন মোড়ে দীর্ঘ সময় বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াকুব মিয়া নামের এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় ঘণ্টা খানেক দাঁড়িয়ে থেকেও বাস মিলছে না। রিকশা বা অটোরিকশাগুলো যে ভাড়া চাচ্ছে তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অনেকটা নিরুপায় হয়েই ভিজে ভিজে কর্মস্থলের দিকে ছুটছেন মানুষ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছিল একই চিত্র। ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে অনেক স্কুলে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে, কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা থাকায় শিক্ষার্থীদের বৃষ্টিতে ভিজে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে দেখা গেছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
নগরীর বাইরেও চিত্রটি একই রকম হতাশাজনক। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের হাটহাজারীর বড়দিঘীর পাড় ও আমানবাজার এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। এতে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সাথে চট্টগ্রামের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সিএনজি অটোরিকশা চালকরা বিকল্প সড়ক ব্যবহারের চেষ্টা করলেও সব জায়গায় পানি জমে থাকায় তারাও হিমশিম খাচ্ছেন। হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকার প্রধান সড়কগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ায় মূল ভূখণ্ডের সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অনেক স্থানে। পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টি নামলেই এখন চট্টগ্রামকে জলমগ্ন অবস্থায় দেখতে হয়, যা নগর পরিকল্পনার বড় ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানিয়েছেন, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এই অতিভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। শুধু মঙ্গলবার দুপুর ১২টার আগের ২৪ ঘণ্টায়ই ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে কেবল সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যেই ঝরেছে ৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টি। এমন বৃষ্টিপাত চট্টগ্রামের নিচু এলাকাগুলোর ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে। আবহাওয়া অফিসের সতর্কতা অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকবে এবং বিক্ষিপ্তভাবে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। পাহাড়ী এলাকায় যারা বসবাস করছেন, তাদের জন্য এই বৃষ্টিপাত ভূমিধসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই চরম দুর্ভোগের দিনেও নগরীর মানুষের মানবিকতার চিত্রও চোখে পড়েছে। পানি ভেঙে কর্মস্থলে যাওয়ার সময় বয়স্ক মানুষকে সাহায্য করতে তরুণদের এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জন্য শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতেও দেখা গেছে। তবুও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার এই সংকট নিরসনে কর্তৃপক্ষ কেন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল আজ পর্যন্ত নগরবাসী সেভাবে ভোগ করতে পারেনি বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
বৃষ্টির এই মৌসুমে চট্টগ্রামবাসীর জন্য প্রতিটি দিন এখন আতঙ্কের। কখন আকাশ মেঘে ঢাকা পড়বে আর কখন রাস্তাঘাট তলিয়ে যাবে—এই দুশ্চিন্তায় থাকেন সবাই। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে যারা ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন, তাদের জন্য এই বৃষ্টি এক বড় কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনিকভাবে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বারবার বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন কতটা, তা আজ সবার সামনেই স্পষ্ট। চট্টগ্রামের এই নজিরবিহীন বৃষ্টিপাত এবং এর ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং নগর ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে আমাদের আরও কতদূর যেতে হবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্তে চট্টগ্রামবাসীর প্রতি সহমর্মিতা জানাচ্ছে এবং আশা করছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা জোরদার করে জনদুর্ভোগ কমিয়ে আনা হবে।