১৫ বছর পর শিশু হত্যায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
১৫ বছর পর শিশু হত্যায় তিনজনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ পনেরো বছরের প্রতীক্ষা, প্রতিটি দিন আর প্রতিটি মুহূর্ত ছিল কেবল ন্যায়বিচারের আশায় বুক বেঁধে থাকা। অবশেষে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ দেখল নিহত শিশু মাহফুজের পরিবার। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর সেই হৃদয়বিদারক শিশু হত্যা মামলায় আজ মঙ্গলবার ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এর বিজ্ঞ বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে অপহরণের পর হত্যার দায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরাধের ভয়াবহতা ও নির্মমতা বিবেচনা করে আদালত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডও প্রদান করেছেন, যা অপরাধীদের নিষ্ঠুরতার বিচারিক দলিল হয়ে রইল।

ঘটনাটি ছিল ২০১২ সালের ৫ জুলাইয়ের এক গুমোট সন্ধ্যায়। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রামের আট বছরের নিষ্পাপ শিশু মাহফুজ তার বাড়ি থেকে ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ে জামে মসজিদে যাচ্ছিল। সেই ছিল তার শেষ পথচলা। পথিমধ্যে ঘাতকচক্র তাকে অপহরণ করে এবং পরিবারকে ফোন করে আকাশচুম্বী মুক্তিপণ দাবি করে। অসহায় পরিবার তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আকুতি জানালেও ঘাতকদের মন গলেনি। প্রায় দেড় মাস ধরে শিশুটিকে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে ২০১২ সালের ২০ আগস্ট রাতে মাহমুদা খানম উষার বাড়িতে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় শিশুটির গলায় ফাঁস লাগিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার নিথর দেহটি অবলীলায় পাশের মেহগনি বাগানে ফেলে রেখে যায় পাষণ্ডরা।

মামলার নথিপত্র এবং তদন্তে উঠে এসেছে যে, শিশুটির বাবা তখন ইতালিতে প্রবাসী ছিলেন এবং ঘাতক চক্রের সঙ্গে তাদের পূর্বশত্রুতা ছিল। এই ব্যক্তিগত আক্রোশ ও প্রতিশোধের বলি হতে হলো আট বছরের এক শিশুকে। ঘটনার পরদিন ৬ জুলাই মাহফুজের মা স্বপ্না বেগম কাশিয়ানী থানায় মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং পুলিশের তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। মামলার গুরুত্ব ও নৃশংসতার কারণে ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। বিচার চলাকালে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রপক্ষে ২৩ জন সাক্ষী তাদের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, যা এই বিচার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সুসংহত ও তথ্যবহুল করে তুলেছিল।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জামাল শেখ, শামীম শেখ ও রঞ্জু শেখ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে মাহমুদা খানম উষা ও বিল্লাল শেখকে। এ ছাড়া একই মামলার সঙ্গে জড়িত দুই নাবালক আসামি মেহেদী ও সাদ্দামকে এর আগে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর ১০ বছর করে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছিল। আদালত আজ যে রায় ঘোষণা করেছেন, তা কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়া এক মানবিক উপাখ্যান। আট বছরের একটি শিশু কী অপরাধ করেছিল, কেন তাকে মুক্তিপণের জন্য জীবন দিতে হলো—এই প্রশ্নের উত্তর আজ রাষ্ট্র তার বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিশ্চিত করল।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন লক্ষ্য করছে যে, এ ধরনের অপরাধ কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করে না, বরং পুরো সমাজকে নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা সত্ত্বেও অপরাধীরা যে শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রেহাই পায়নি, তা আমাদের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। শিশু মাহফুজের মায়ের যে কান্না পনেরো বছর ধরে অবিরাম ঝরছিল, সেই কান্নার কিছুটা হলেও উপশম হয়েছে আজকের এই রায়ে। যদিও কোনো দণ্ডই একটি মায়ের হারানো সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারে না, তবুও এই বিচার অন্তত একটি স্বস্তি হয়ে থাকবে।

এই মামলার রায় ঘোষণার সময় আদালতের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত থমথমে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন যে, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়। অন্যদিকে আসামিপক্ষে আটজন সাফাই সাক্ষী হাজির করা হলেও তারা তাদের মক্কেলদের নির্দোষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আইনের শাসন যে সমুন্নত রয়েছে, তা আজকের রায় আবারও প্রমাণ করল। আমরা আশা করি, বিচারিক এই রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

পরিশেষে বলা যায়, শিশু মাহফুজের স্মৃতি আজও তার স্বজনদের কাছে এক তীব্র বেদনাদায়ক বাস্তবতা। ঘাতকরা ভেবেছিল তারা হয়তো আড়াল হয়ে থাকবে, কিন্তু ন্যায়বিচারের সূর্য শেষ পর্যন্ত উদিত হয়েছে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন অপরাধের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার এবং আমরা প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা ও অধিকারের পক্ষে অটল। সমাজ থেকে এ ধরনের বর্বরতা নির্মূলে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আজকের এই রায় কেবল একটি আইনি সমাধান নয়, বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের এক অবিস্মরণীয় বিজয় হিসেবে ইতিহাসে টিকে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত