প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারের উখিয়ার পাহাড়ি জনপদে এখন কেবলই হাহাকার আর মৃত্যু আতঙ্ক। প্রকৃতির অমোঘ রুদ্ররোষে এবং মানুষের অপরিকল্পিত বসতি স্থাপনের ফলে বালুখালীসহ বিভিন্ন আশ্রয়শিবির পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুপুরীতে। গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণ ও বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা মানবিক বিপর্যয়ের চরম সীমায় পৌঁছেছে। পাহাড়ের পাদদেশে বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি ঘরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ মানুষের জীবন এখন প্রতিটি মুহূর্তে ঝুঁকির মুখে। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় উখিয়ার আশ্রয়শিবিরগুলোতে নিথর হয়ে আসা প্রাণগুলোর আর্তনাদ আর কাদা মাটির নিচে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প যেন প্রতিদিন নতুন করে বেদনার কাব্য রচনা করছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু খাড়া পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটা পাহাড়ের ঢালে ও পাদদেশে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে ৪৫টি করে অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর। একটি ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে দুই থেকে চারটি রোহিঙ্গা পরিবার। ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড়ের নরম মাটি আলগা হয়ে যাওয়ায় তা ধসে সরাসরি ঘরগুলোর ওপর পড়ছে। গতকাল বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাসিন্দারা ঘর থেকে কাদা ও ঢলের পানি সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু আকাশের অঝোর ধারায় তাদের সব শ্রম বিফলে যাচ্ছে। পাহাড়ের ওপরের ৩০ থেকে ৪০ ফুট খাড়া মাটি যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়ার অপেক্ষায় আছে, যা নিয়ে বাসিন্দাদের রাত কাটে নির্ঘুম আতঙ্কে।
গত রোববার রাতের একটি ঘটনা আশ্রয়শিবিরগুলোতে নতুন করে শোকের ছায়া ফেলেছে। রাত তিনটার দিকে বালুখালীর ক্যাম্প-১১-তে পাহাড়ধসে একই পরিবারের এক নারী ও দুই শিশুসহ চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। সেই রাতেই জামতলি ও কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আরও চারজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আটটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনা পুরো আশ্রয়শিবিরে এক ভয়াবহ ভীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে যারা রাখাইন রাজ্য ছেড়ে দূর-দূরান্তে পাড়ি জমিয়েছিল, তারা আজ এখানে এসেও প্রকৃতির কাছে হার মানছে। আশ্রয়শিবিরগুলোতে বসবাসরতদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—জীবন বাঁচানোর জন্য তারা কি ভুল জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে?
আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত ৪৮ ঘণ্টায় উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে ৪০৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপটি সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হওয়ায় আগামী কয়েকদিনও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস রয়েছে। পাহাড়ের মাটি মূলত বেলে-দোআঁশযুক্ত হওয়ায় পানি শোষণ করার পর তা মাখনের মতো নরম হয়ে যায়। গাছপালা উজাড় করে পাহাড় কাটার ফলে মাটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ফাটল তৈরি হয়ে পাহাড় ধসে পড়ছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, গত দুই দিনে আশ্রয়শিবিরগুলোতে ১৯৩টির বেশি ছোট-বড় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে।
আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দাদের মানবেতর জীবনযাপন কেবল পাহাড়ধসের আতঙ্কই নয়, বরং ঢলের পানির সাথে আসা কাঁদা মাটি তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ঘরের ভেতর জমে থাকা কাদা পরিষ্কার করতে করতে নারীদের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। পাহাড়ের ওপর থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে চলাচলের রাস্তাগুলো এতটাই পিচ্ছিল হয়ে গেছে যে, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও সুপেয় পানির জন্য নিচের বাজারে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বয়স্ক ও শিশুদের জন্য এই পরিবেশে বেঁচে থাকা এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ায় রোহিঙ্গাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ও সামান্য সঞ্চয়ও নষ্ট হয়ে গেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা অন্তত তিন হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে মোট ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে সরানোর প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তা যেন অনেকটা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া লড়াই। নতুন আসা অনেক রোহিঙ্গা আবার পাহাড়ের গভীরে বন কেটে ঘর তৈরি করছেন, যা ভূমিধসের ঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব ক্যাম্প ইনচার্জকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি পরিবারকে চিহ্নিত করে সরিয়ে নেওয়ার কাজ অব্যাহত আছে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই মানবিক বিপর্যয়ের দিকে গভীর নজর রাখছে। ২০১৭ সালে যখন পাহাড় কেটে গাছপালা উজাড় করে এই আশ্রয়শিবিরগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল, তখন থেকেই পরিবেশবিদরা এই বিপদের কথা সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু পাহাড় কাটার সেই উন্মাদনা আজও বন্ধ হয়নি। একটি আধুনিক ও সুপরিকল্পিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই লাখ লাখ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। বনভূমি রক্ষা ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য পরিকল্পিত আবাসন ও টেকসই সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতির সঙ্গে এই অসম লড়াইয়ে মানুষই শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়, যা উখিয়ার এই পাহাড়গুলোর আর্তনাদ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
পরিশেষে, উখিয়ার পাহাড়গুলো আজ আর নিরাপদ আশ্রয় নয়, বরং সেগুলো হয়ে উঠেছে এক একটি মরণফাঁদ। আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা দেখলে প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারের মায়ের বুকে আতঙ্ক দানা বাঁধে—তাদের সন্তানরা কি আগামী সকাল দেখতে পাবে? এই মানবিক সংকট শুধু তাদের নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য এক বড় পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা ও সরকারি ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ সব মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর করাই এখন প্রধান কাজ। আমরা প্রত্যাশা করি, ঝড়ের এই প্রকোপ যেন দ্রুত কমে আসে এবং পাহাড়ে বসবাসরত অসহায় মানুষগুলো নতুন কোনো ক্ষতির সম্মুখীন না হয়। পাহাড় বাঁচলে তবেই বাঁচবে পরিবেশ, আর পরিবেশ ভালো থাকলে রক্ষা পাবে মানুষের জীবন।