এআই জাদুতে স্যামসাংয়ের মুনাফা: তবুও শেয়ারে ধস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১ বার
এআই জাদুতে স্যামসাংয়ের মুনাফা: তবুও শেয়ারে ধস

প্রকাশ: ০৭ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির জয়জয়কার চলছে। এই প্রযুক্তির বিকাশে চিপ নির্মাতাদের চাহিদা আকাশচুম্বী, যার প্রত্যক্ষ সুফল পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিদানব স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন তথা দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ১৯ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। মুনাফার এই উল্লম্ফন বিশ্ব অর্থনীতিতে স্যামসাংয়ের শক্তিশালী অবস্থানের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। তবে মুনাফার এই আকাশছোঁয়া সাফল্যেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি নেই। বরং উল্টো চিত্র দেখা গেছে শেয়ারবাজারে, যেখানে ফল প্রকাশের দিনই স্যামসাংয়ের শেয়ারদর বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে।

স্যামসাংয়ের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তাদের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন উন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাত লাখ ১৯ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা। অথচ গত বছর একই সময়ে তাদের মুনাফা ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন উন বা ৩৮ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে মুনাফার এই নাটকীয় পরিবর্তন স্যামসাংয়ের ব্যবসায়িক কৌশলের কার্যকারিতাকেই নির্দেশ করে। একই সাথে কম্পানিটির রাজস্ব আয় ১২৯ শতাংশ বেড়ে ১৭১ ট্রিলিয়ন উনে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাজার বিশ্লেষকদের সব পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। মূলত এআই প্রযুক্তিচালিত ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি চিপের অভূতপূর্ব চাহিদা এই বিশাল সাফল্যের নেপথ্যে কাজ করেছে।

তবে মুনাফার এই ঝলমলে হিসাবের বিপরীতে শেয়ারবাজারের চিত্র ছিল বেশ হতাশাজনক। মঙ্গলবার লেনদেনের একপর্যায়ে স্যামসাংয়ের শেয়ারদর ১০ শতাংশেরও বেশি পড়ে যায় এবং দিনের শেষে প্রায় ৬ দশমিক ৯ শতাংশ দরপতন নিয়ে লেনদেন শেষ হয়। একই সাথে স্যামসাংয়ের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্স-এর শেয়ারদরও ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ভালো আয়ের সংবাদের পর শেয়ারের এমন দরপতন স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রযুক্তিবিশ্বে এই ঘটনাকে অনেকে ‘অতিরঞ্জিত প্রত্যাশার বাস্তব রূপায়ণ’ হিসেবে দেখছেন।

বিনিয়োগকারীদের এই উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো এআই খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব। মেটা, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন এবং অ্যালফাবেটের মতো বৃহৎ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন এআই অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টারের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। বাজার বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ আশঙ্কা করছেন যে, এই বিশাল বিনিয়োগের গতি যদি কোনো কারণে স্থবির হয়ে পড়ে বা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের এআই বাজেটে কাটছাঁট শুরু করে, তবে মেমোরি চিপের চাহিদায় বড় ধরনের ধ্বস নামতে পারে। বর্তমানের এই চিপ-নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে, যা সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে শেয়ারের দামে।

আর্থিক পরিস্থিতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সেমিকন্ডাক্টর বিভাগের কর্মীদের জন্য দেওয়া বোনাস। স্যামসাং কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত মে মাসে সম্পাদিত বেতন চুক্তি অনুযায়ী তাদের কর্মীদের জন্য বড় অঙ্কের বোনাসের অর্থ আগেই সরিয়ে রাখা হয়েছে। আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই বোনাসের বিশাল ব্যয়টি না থাকত, তবে কম্পানিটির পরিচালন মুনাফা ১০০ ট্রিলিয়ন উনের মনস্তাত্ত্বিক সীমাও ছাড়িয়ে যেতে পারত। এই বিপুল পরিমাণ বোনাস কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি বিনিয়োগকারীদের জন্য তা ছিল মুনাফার অংশ কিছুটা কমে যাওয়ার কারণ। আগামী ৩০ জুলাই স্যামসাং যখন তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকের পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, তখন প্রতিটি বিভাগের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া যাবে।

প্রযুক্তি ও বাণিজ্যের এই জটিল সমীকরণের পেছনে রয়েছে মেমোরি চিপের বাজারের অস্থিরতা। চিপ নির্মাতারা এখন আর সাধারণ কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মেমোরির ওপর নির্ভরশীল নয়; তারা এখন এআই চালিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপের বাজারের ওপর বাজি ধরছে। স্যামসাংয়ের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের চাহিদা খুব একটা বাড়েনি। ফলে পুরো চিপ শিল্পের গতিপথ এখন কেবল এআই-এর ওপর নির্ভরশীল। এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই শেয়ারবাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে বলে মনে করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন প্রযুক্তির এই গ্লোবাল ট্রেন্ডের দিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ রাখছে। স্যামসাংয়ের মুনাফার ১৯ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া নিশ্চিতভাবেই প্রযুক্তি খাতের এক বিশাল অর্জন। তবে মুনাফার চেয়েও শেয়ারবাজারের সংবেদনশীলতা আজকের দিনে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা এখন মুনাফার চেয়ে ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার ওপর বেশি নজর দিচ্ছেন। এআই বিপ্লব যদি দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়, তবে স্যামসাংয়ের মতো চিপ নির্মাতারা দীর্ঘসময় ধরে মুনাফার এই জোয়ার ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু বাজারের অস্থিরতা কাটানোর জন্য স্যামসাংকে এখন মুনাফার পাশাপাশি ভবিষ্যতের উদ্ভাবনী পরিকল্পনার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, স্যামসাংয়ের এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মুনাফা কেবল একটি খণ্ডিত চিত্র। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা সবসময় ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকেন। স্যামসাংয়ের এআই চিপের চাহিদা যেমন আগামী দিনে তাদের আরও উঁচুতে নিতে পারে, তেমনি ভুল বিনিয়োগ বা চাহিদার ঘাটতি তাদের বড় বিপদের মুখেও ফেলতে পারে। ৩০ জুলাইয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে গোটা বিশ্ব। সেই প্রতিবেদনই হয়তো নির্ধারণ করবে যে, এই পতনের পেছনে কেবল গুজব ছিল নাকি বড় কোনো ঝুঁকি লুকিয়ে আছে। ততক্ষণ পর্যন্ত প্রযুক্তিপ্রেমী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য স্যামসাংয়ের যাত্রা এক বড় রহস্যের মতোই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত