প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে সিরিয়ার অবস্থান সবসময়ই বেশ সংবেদনশীল। সেই সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের বুকে যখন এক ফরাসি প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে হামলার মতো ঘটনা ঘটে, তখন তা বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দেয়। আজ মঙ্গলবার সিরিয়া সফররত ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সফরের মধ্যেই দামেস্কে অন্তত দুটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে। এই ঘটনায় অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজন কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি ও সফরকে ঘিরে যখন কূটনৈতিক মহলে আলোচনার ঝড় বইছে, ঠিক তখনই এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিস্ফোরণ সিরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালো।
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানার প্রতিবেদন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দামেস্কের জনবহুল একটি এলাকায় এই বিস্ফোরণগুলো ঘটানো হয়েছে। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দুপুরে যখন বিস্ফোরণের বিকট শব্দ দামেস্কের আকাশ কাঁপিয়ে তুলছিল, তখন শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রাস্তায় থাকা একটি গাড়িতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আল-জাজিরাসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই ঘটনার ভয়াবহতা নিশ্চিত করেছে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ যে হোটেলে অবস্থান করছিলেন তার কাছাকাছি এলাকায় এই বিস্ফোরণ ঘটানোয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে একটি সুপরিকল্পিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবেই দেখছে।
ঘটনার সময় প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে পিপলস প্যালেসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিলেন। মাখোঁর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তিনি বিস্ফোরণের সরাসরি শব্দ শোনেননি এবং তার সফর পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদসহ পুরো এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে এবং বিস্ফোরণের পর থেকে আশপাশের সব সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এমন কঠোর নিরাপত্তা বলয় এড়িয়ে কীভাবে হামলার ঘটনা ঘটল? নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক মহলে সিরিয়ার বর্তমান নাজুক নিরাপত্তা অবস্থাকে বারবার সামনে নিয়ে আসা এবং বিদেশি অতিথিদের সফরকে নিরুৎসাহিত করা।
দামেস্কভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইসমাত আল-আবসি এই হামলার ধরন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ফরাসি প্রেসিডেন্টের বহর যে রুটে যাওয়ার কথা ছিল, বিস্ফোরণের স্থানটি তার খুব কাছাকাছি হওয়ায় এটি কোনো বড় ষড়যন্ত্রের অংশ কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। বিস্ফোরকগুলো কি প্রেসিডেন্টের বহরকে লক্ষ্য করেই পেতে রাখা হয়েছিল, নাকি এটি কেবল অস্থিরতা তৈরির একটি বিচ্ছিন্ন প্রয়াস—তা এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। তবে এটি স্পষ্ট যে, সিরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোতে বড় ধরনের কোনো ফাঁক রয়ে গেছে, যা কাজে লাগিয়ে হামলাকারীরা তাদের লক্ষ্য অর্জন করার সুযোগ পাচ্ছে। এই ফাঁকগুলো দ্রুত পূরণ না করতে পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সিরিয়ার ইমেজ সংকটের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে।
উল্লেখ্য যে, গত সপ্তাহে দামেস্কের কেন্দ্রস্থলে একটি ক্যাফেতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৯ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন এবং আরও ২০ জন আহত হয়েছিলেন। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ প্রমাণ করে যে, সিরিয়ার রাজধানী বর্তমানে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। তারা এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ করছে। জনবহুল এলাকায় এভাবে বোমার ব্যবহার কেবল সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতিই করে না, বরং দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন পুরো বিশ্বের এই নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে গভীর পর্যবেক্ষণ রাখছে। মাখোঁর এই সফর ছিল সিরিয়ার সঙ্গে ফ্রান্সের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুনভাবে ঝালাই করার একটি সুযোগ। তবে সফরের মাঝপথে এই হামলা সেই সুযোগকে কেবল কঠিন করেনি, বরং দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার শান্তি প্রক্রিয়ার পথে এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, সিরিয়ার প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ মিলে অতি দ্রুত এই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনবে এবং এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে একটি শান্তিময় সিরিয়া গড়ার যে স্বপ্ন দেশটির জনগণ দেখছে, তা বাস্তবায়নে নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে বলা যায়, দামেস্কের এই বিস্ফোরণ কেবল একটি ঘটনা নয়, বরং এটি বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি রক্ষায় আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রচেষ্টার যে সমন্বয় দরকার, সেখানে সম্ভবত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁর সফর চলাকালীন এমন ঘটনা সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সক্ষমতা ও নিরাপত্তামূলক প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকে জনসম্মুখে উন্মোচিত করেছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সিরিয়া সরকার তাদের নিরাপত্তা নীতিতে বড় ধরনের সংস্কার আনবে এবং দামেস্কের রাস্তাগুলোকে আবারও নিরাপদ করে তুলবে। আমরা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে সবসময় সোচ্চার।