প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো দিন দিন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারা কুক। অত্যন্ত ফলপ্রসূ এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও সুসংহতকরণ, শিক্ষা, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অভিবাসন এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে যুক্তরাজ্য সরকার সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস প্রদান করেছেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার।
বৈঠকের শুরুতেই ব্রিটিশ হাইকমিশনার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় এবং এই যাত্রায় যুক্তরাজ্য বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও নীতিনির্ধারণী সহযোগিতা দিতে সবসময় আগ্রহী। দুই দেশের এই দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি জানান, শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন খাতে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তা বিশ্বমঞ্চে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। হাইকমিশনারের এই ইতিবাচক মনোভাব বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক বিকাশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে, বাংলাদেশ সর্বদা যুক্তরাজ্যকে তার এক ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে। মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে তারা বদ্ধপরিকর। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ বর্তমান সংকট কাটিয়ে গণতন্ত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথে অবিচল রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিশেষ গুরুত্বসহকারে আলোচনা হয়। মন্ত্রী জানান, নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় একটি সুশৃঙ্খল নির্বাচনী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিক। এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রসারে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়েও আলোচনা হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের উদীয়মান বিভিন্ন খাতে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের একটি চমৎকার পরিবেশ বিরাজ করছে এবং ব্রিটিশ উদ্যোক্তারা যদি আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসেন, তবে তা দুই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। হাইকমিশনার সারা কুক এ আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে জানান, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অংশীদার হতে সবসময়ই আগ্রহী এবং বিনিয়োগ বাড়াতে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের উৎসাহ প্রদান করা হবে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ব্রিটিশ হাইকমিশনার সুখবর দিয়েছেন। তিনি জানান, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও প্রসারিত করার পরিকল্পনা করছে ব্রিটিশ সরকার। এতে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণ শেষে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে বলে আশা করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায়ও যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করার যে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তাও আজকের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধিরা নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে কাজ করবেন বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়।
একই দিনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন ইউনাইটেড ন্যাশনস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেস বা ইউএনওপিএস-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার সুধীর মুরালিধরন। এই সাক্ষাতে মূলত বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার টেকসই সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ইউএনওপিএস-এর কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে তারা মন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশের এই ধরণের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে। গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে যুক্তরাজ্যের এই সহায়তার আশ্বাস দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার যে লক্ষ্য বর্তমান সরকার নিয়েছে, তা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা আমাদের লক্ষ্যকে আরও ত্বরান্বিত করবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন দেশের এই অগ্রযাত্রার প্রতিটি মাইলফলকের ওপর নিয়মিত নজর রাখছে এবং আমরা বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আগামী দিনে একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে।