প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানব সভ্যতার ইতিহাসে জুয়া এক অভিশপ্ত নাম। বিনোদনের নামে এটি এমন এক মরণব্যাধি, যা ব্যক্তি মানুষের জীবন থেকে শুরু করে একটি সুস্থ সবল পরিবার ও সমাজ কাঠামোকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। ইসলামি শরিয়তে জুয়াকে ‘কিমার’ বা ‘মাইসির’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে এবং একে সম্পূর্ণরূপে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে অনলাইন, অফলাইন, অ্যাপ-ভিত্তিক কিংবা প্রাচীন পদ্ধতির সব ধরনের জুয়াই এই নিষিদ্ধের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি আইনজ্ঞ ও স্কলারদের মতে, জুয়া হলো এমন এক লেনদেন বা প্রতিযোগিতা যেখানে পক্ষগুলোর মধ্যে লাভ বা ক্ষতির চরম অনিশ্চয়তা থাকে এবং প্রবল ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। কোনো ব্যক্তি যখন বাজি ধরে বা জুয়ায় লিপ্ত হয়, তখন সে জানে না তার পরিণাম কী হবে। এই অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির কারণেই ইসলাম একে শয়তানের কাজ বলে আখ্যায়িত করেছে।
কুরআন মজিদের সূরা আল-মায়িদায় আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদি এবং ভাগ্য নির্ধারণের তীর—এসবই শয়তানের অপবিত্র কাজ। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের এগুলো থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা সফল হতে পারে। এই আয়াতে শয়তানের চক্রান্তের একটি গভীর দিক উন্মোচিত হয়েছে। জুয়ার মাধ্যমে শয়তান মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষের বীজ বপন করতে চায়। জুয়াড়ি যখন অন্য কোনো খেলোয়াড় বা বাজিকরকে হারিয়ে তার সম্পদ আত্মসাৎ করে, তখন বিজিত ব্যক্তির মনে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলে ওঠে। এভাবে এক সময়ের বন্ধু বা পরিচিত মানুষের মধ্যে চিরস্থায়ী শত্রুতা তৈরি হয়। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং মানুষের মন থেকে আল্লাহর ভয় ও ইবাদতের মানসিকতাকেও মুছে ফেলে। ফলে মানুষ সালাত ও আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল হয়ে পড়ে।
জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে সাতটি অকাট্য ও যৌক্তিক কারণ রয়েছে যা সমাজ ও ব্যক্তির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, জুয়া সরাসরি পরিবার ও সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনে। এটি মানুষের কষ্টার্জিত হালাল সম্পদ অবৈধ পথে নষ্ট করে দেয়, ধনী পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয় এবং এক সময়ের সম্মানিত ব্যক্তিকে চরম অপমান ও লাঞ্ছনার মুখে ফেলে। দ্বিতীয়ত, জুয়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এটি একটি অসামাজিক কর্মকাণ্ড, যেখানে অন্যের বিপদে আনন্দ পাওয়ার প্রবণতা কাজ করে। তৃতীয়ত, এটি মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে বিরত রাখে। জুয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষটি কখন সালাতের সময় পার করে ফেলে, তা বোঝার ক্ষমতাও হারায়।
চতুর্থত, জুয়া মানুষের মূল্যবান সময় ও শ্রমের চরম অপচয় ঘটায়। এটি একটি পাপপূর্ণ বিনোদন যা মানুষকে অলসতা ও কর্মবিমুখতার দিকে ঠেলে দেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উৎপাদনশীল কোনো অবদান রাখা তো দূরের কথা, এটি ব্যক্তিকে এক ধরনের পরজীবী মানসিকতায় অভ্যস্ত করে তোলে। পঞ্চমত, জুয়া অপরাধের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। যে ব্যক্তি জুয়ায় নিজের সর্বস্ব হারায়, সে অর্থ জোগাড়ের জন্য চুরি, ডাকাতি, ঘুষ গ্রহণ বা আত্মসাতের মতো জঘন্য অপরাধের দিকে ধাবিত হতে দ্বিধা করে না। ষষ্ঠত, এটি মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, স্নায়বিক দুর্বলতা থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে আত্মহত্যা বা উন্মাদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় জুয়া। সর্বশেষ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, জুয়া অন্যান্য বহু পাপের দরজা খুলে দেয়। জুয়ার আসরে প্রায়ই মদ, মাদক, অশ্লীলতা ও অসৎ সঙ্গের মহড়া চলে। সেখানে যারা লিপ্ত থাকে, তারা প্রত্যেকেই একে অপরের ক্ষতির অপেক্ষায় থাকে, যা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেই ভেঙে দেয়।
সবশেষে বলা প্রয়োজন, ইসলামি অর্থব্যবস্থায় উপার্জনের পথ হতে হবে এমন, যা নিজের পাশাপাশি সমাজ ও অর্থনীতির কল্যাণ সাধন করবে। জুয়া এমন এক উপার্জনের পথ, যা কোনো প্রকার কল্যাণ বয়ে আনে না; বরং এটি মানুষের কর্মস্পৃহা ও সৃষ্টিশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করে। একজন জুয়াড়ি জেতার লোভে বা হারার যন্ত্রণায় এতটাই নিমগ্ন থাকে যে, সে পৃথিবীর আর কোনো দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারে না। তার মন ও মস্তিষ্ক সর্বদা জুয়ার টেবিলেই পড়ে থাকে। এই আসক্তি কেবল তাকেই নিঃস্ব করে না, বরং পুরো পরিবারকে ঠেলে দেয় এক গভীর অন্ধকারে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সম্মানিত করেছেন, আর জুয়া মানুষকে পশুত্বের নিম্নস্তরে নামিয়ে আনে। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকসহ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব হলো জুয়ার মতো এই ভয়ংকর মরণব্যাধি থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর ও পবিত্র পরিবেশ উপহার দেওয়া। আল্লাহর বিধান মেনে চলার মধ্যেই কেবল প্রকৃত শান্তি ও সফলতা নিহিত।