ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে উচ্চ সুদে ঋণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে উচ্চ সুদে ঋণ

প্রকাশ: ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি তেল পরিশোধন প্রক্রিয়ায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সরকার এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান বাজারমূল্যে যা প্রায় ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার সমতুল্য। তবে এই ঋণের শর্তাবলি নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা আইএসডিবি থেকে নেওয়া এই ঋণটি তুলনামূলকভাবে বেশ কঠিন শর্তে এবং উচ্চ সুদে অনুমোদিত হয়েছে। সহজ শর্তের ঋণের সংকুচিত সুযোগের এই যুগে সরকার বাধ্য হয়েই বাজারভিত্তিক ও উচ্চ ব্যয়ের এই বৈদেশিক ঋণের পথে হাঁটছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ‘অনমনীয় ঋণ-সংক্রান্ত কমিটি’ আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশাল অংকের ঋণ গ্রহণের প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইএসডিবির প্রতিনিধিদের একাধিক দফার আলোচনার পর এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে। ঋণের কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি প্রচলিত কোনো সহজ শর্তের উন্নয়ন সহায়তা নয়; বরং আইএসডিবির লিজ ফাইন্যান্সিং মডেলে নেওয়া এই ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সূচক সোফর বা ‘সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট’-এর ওপর ভিত্তি করে। বর্তমানে সোফরের হার প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি এবং এর সঙ্গে অতিরিক্ত ১ দশমিক ৬০ শতাংশ স্প্রেড যুক্ত হওয়ায় ঋণের কার্যকর সুদের হার দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশের মতো। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সাধারণত ২ থেকে ৩ শতাংশ সুদে যে ঋণ পাওয়ার সুযোগ থাকে, তার তুলনায় এই ঋণের ব্যয় অনেক বেশি।

ইআরএল-এর তেল শোধন সক্ষমতা বৃদ্ধি কেন প্রয়োজন, তা অনুধাবন করা জরুরি। বর্তমানে দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর পরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল। ইআরএল-এর সক্ষমতা বছরে ৩০ লাখ টনে উন্নীত করা সম্ভব হলে দেশের সামষ্টিক জ্বালানি সংকটে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এটি কেবল দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তাই নিশ্চিত করবে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, প্রকল্পের অর্থনৈতিক লাভজনকতা কি এই উচ্চ সুদের ঋণের চাপ সামাল দিতে সক্ষম হবে? সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো এখন সময়ের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। সহজ শর্তের অর্থায়নের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে উচ্চ ব্যয়ের এই ঋণ নেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প পথ খুবই সীমিত ছিল।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কঠিন শর্তের এই ঋণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে ডলারের বর্তমান অস্থির বাজারে আন্তর্জাতিক সূচকের ওঠানামার ওপর নির্ভরশীল ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা যেহেতু সরাসরি দেশের উৎপাদন ও অর্থনীতির গতির সঙ্গে জড়িত, তাই এই ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে কেবল শোধন ক্ষমতাই বাড়বে না, বরং পরিশোধন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে আধুনিক প্রযুক্তি, যা দেশের জ্বালানি মানোন্নয়নে সহায়ক হবে।

এই ঋণের প্রক্রিয়াটি কেবল একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জ্বালানি কৌশলে এক বিশাল পরিবর্তনের পূর্বাভাস। এতদিন রিফাইনারি ইউনিটে যে পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, তার সীমাবদ্ধতার কারণে শোধন ক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। ১০০ কোটি ডলারের এই বিনিয়োগ সেই সীমাবদ্ধতাকে দূর করবে এবং আগামী কয়েক দশকের জন্য দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা তৈরি করবে। সাধারণ জনগণের মাঝে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে, জ্বালানি তেলের দামের ওপর এই উচ্চ সুদের প্রভাব পড়বে কি না। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে জ্বালানি খাতের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রতিফলন খুচরা বাজারে পড়ার একটি ঝুঁকি থেকেই যায়।

সরকার এখন এই বিশাল ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে একটি বড় দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং এর স্বচ্ছতা এখন সাধারণ মানুষের নজরে থাকবে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক বড় প্রকল্পের খরচ অহেতুক বেড়ে যাওয়ার ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারির এই সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পে যাতে কোনো ধরনের গাফিলতি বা দুর্নীতি না ঘটে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের ওপর। আইএসডিবির মতো প্রতিষ্ঠানের লিজ ফাইন্যান্সিং মডেলের জটিলতা মাথায় রেখে প্রতিটি অর্থায়ন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে মনিটরিং করার ওপর জোর দিয়েছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি নিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ১০০ কোটি ডলারের এই ঋণ গ্রহণ দেশের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। এই অর্থ যদি সঠিকভাবে বিনিয়োগ করা যায় এবং প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবেই এর সুফল সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারবে। ইস্টার্ন রিফাইনারি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকারের এই সাহসী পদক্ষেপকে দূরদর্শী উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন অনেকে, তবে ঋণের কঠোর শর্তাবলি মানিয়ে নেওয়া হবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই পুরো প্রকল্পের অগ্রগতির ওপর গভীর নজর রাখছে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে প্রতিটি আপডেট আপনাদের সামনে তুলে ধরবে। জ্বালানি তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরুক এবং এই ঋণ দেশের উন্নয়নে সার্থকতা বয়ে আনুক, এটাই এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত