নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল প্রস্তাব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬
  • ২১ বার
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ২৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল প্রস্তাব

প্রকাশ: ০৮ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকিগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে দ্রুত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব একটি টেকসই জ্বালানি নীতি গ্রহণের লক্ষ্যে কাজ করছে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক কর্মজোট বা বিডব্লিউজিইডি। বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত এক নীতি সংলাপে তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে অত্যন্ত সাহসী ও যুগান্তকারী কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন।

সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয় নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তিনি আরও বলেন, একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করবে। মন্ত্রীর এই ইতিবাচক বক্তব্য দেশের জ্বালানি খাতে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটতে হলে যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া বিকল্প নেই, তা এখন নীতিনির্ধারকদের কাছেও সমানভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আলোচনায় বিডব্লিউজিইডি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য সাতটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ নীতি-প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল গঠন। এই বিশাল অংকের তহবিল বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এখান থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রি-ফাইন্যান্সিং বা পূর্ব-তহবিল দেওয়া হবে, যাতে তারা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ করতে পারে। বর্তমান ব্যাংকিং বাজারে ঋণের যে উচ্চ সুদহার, তার তুলনায় ৫ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ উদ্যোক্তাদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

এই প্রস্তাবের পাশাপাশি এনবিআর বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বৈষম্যমূলক এসআরও বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সৌর সরঞ্জামের ওপর কর-ছাড়ের ঘোষণা থাকলেও পরবর্তী সময়ে একটি এসআরওর মাধ্যমে সেই সুবিধা কেবল দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি থাকা গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এতে গৃহস্থালি ছাদ সৌরবিদ্যুৎ, সৌরসেচ এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো কর-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিডব্লিউজিইডির মতে, এই বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান কর-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ঘরে ঘরে সৌরবিদ্যুতের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। তারা গৃহস্থালি ও কৃষি-সৌরবিদ্যুতে প্রতি কিলোওয়াটে ২৫ হাজার টাকা ভর্তুকিরও সুপারিশ করেছে।

বর্তমান দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত সক্ষমতা মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে কেবল বড় বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। হাসান মেহেদী, যিনি বিডব্লিউজিইডির সদস্যসচিব হিসেবে এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন, তিনি বলেন, প্রতি ১ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় করে। অর্থাৎ, সৌরবিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া মানে সরকারের জন্য কোনো ব্যয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের একটি কার্যকর ও লাভজনক বিনিয়োগ। তার এই গাণিতিক যুক্তি জ্বালানি আমদানির চাপে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অব্যবহৃত বিশাল জমিতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা, ‘সবুজ জেলা’ বা গ্রিন ডিস্ট্রিক্ট কর্মসূচি চালু করা, বছরে ১০ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নতুন ইউটিলিটি-স্কেল সৌর প্রকল্পে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা। এছাড়া নারী, আদিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাড়তি ১০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাবটিও মানবিক দিক থেকে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রান্তিক মানুষদের জ্বালানি নিরাপত্তার আওতায় আনতে পারলে তা দেশের সামগ্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সাধারণ পরিবার, কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করা হলে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার আরও গতিশীল হবে। পরিবেশ রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার এই সমন্বিত প্রচেষ্টা আমাদের জাতীয় জ্বালানি নীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই রূপান্তর কেবল উন্নয়ন নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। সরকারের যদি সঠিক রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকে এবং বিডব্লিউজিইডির এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই জ্বালানি স্বনির্ভরতার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানির এই রূপান্তর প্রক্রিয়াটি যদি সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়, তবে এটি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করবে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন সব সময় দেশীয় পরিবেশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পক্ষে সোচ্চার। আমরা প্রত্যাশা করি, সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা এই প্রস্তাবগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন। জ্বালানি সংকট নিরসনে সৌরবিদ্যুৎ বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই। আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি সবুজ ও জ্বালানি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার কাজে সরকারকে উদ্বুদ্ধ করি এবং টেকসই উন্নয়নের এই যাত্রায় অংশীদার হই। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের পবিত্র নৈতিক দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত