প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা এবং মিসরের মধ্যকার শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি ফুটবলের ইতিহাসে কেবল গোল বা জয়ের জন্য নয়, বরং রেফারিংয়ের ভয়াবহ ত্রুটি এবং মাঠের ভেতরের নাটকীয়তার জন্য অনেকদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর থেকেই মিসরীয় শিবিরে চলছে তীব্র ক্ষোভ। কিন্তু এই গোল বাতিল বা পেনাল্টি না পাওয়ার যন্ত্রণার পাশাপাশি বর্তমানে ফুটবল বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে মিসরের কোচ হোসাম হাসানের একটি অদ্ভুত ও রহস্যময় অঙ্গভঙ্গি। ম্যাচ চলাকালীন তিনি রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ডাগআউট থেকে যেভাবে দুই হাত বুকের সামনে ক্রস করে ‘এক্স’ সংকেত দেখিয়েছেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধোঁয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতির।
ঘটনাটির সূত্রপাত ম্যাচের প্রথমার্ধে যখন একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে মিসর। রেফারির প্রতিটি সিদ্ধান্তে বিরক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে হোসাম হাসান ডাগআউটের সামনে এসে নিজের দুই হাত ক্রস করে বুকের সামনে একটি ‘এক্স’ আকৃতি তৈরি করেন। পরে একইভাবে মাথার ওপরেও তিনি সেই সংকেত প্রদর্শন করেন। তার এই প্রতিক্রিয়ার পরপরই ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের দৌড়ে এসে তাকে হলুদ কার্ড দেখান। কিন্তু এই সংকেত কেন এবং কী উদ্দেশ্যে দেখানো হয়েছিল, তা নিয়ে মাঠের দর্শক থেকে শুরু করে টিভি পর্দার সামনে বসে থাকা কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীর মনে প্রশ্ন দানা বেঁধেছে।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী এই ‘এক্স’ সংকেতটির একটি নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। বর্ণবাদ বা জাতিগত বিদ্বেষ দমনে ফিফার নতুন প্রটোকল অনুযায়ী, মাঠে কোনো খেলোয়াড়, কোচ কিংবা ম্যাচ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বর্ণবাদী আচরণ করা হলে প্রতিকার চেয়ে তারা দুই হাত ক্রস করে বুকের সামনে ‘এক্স’ আকৃতির সংকেত দেখাতে পারেন। এটি হলো বর্ণবাদবিরোধী সংকেত। এই সংকেত দেখালে রেফারি বাধ্য হয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবেন এবং প্রয়োজনবোধে ম্যাচ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ম্যাচ পরিত্যক্ত করার ক্ষমতাও রেফারির রয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হোসাম হাসান কি বর্ণবাদের অভিযোগ জানাতে চেয়েছিলেন, নাকি তিনি নিছকই রেফারিকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ম্যাচটি ‘ফিক্সড’ বা পাতানো?
ফুটবল মহলে গুঞ্জন উঠেছে যে, কোচ কি আসলে রেফারির পক্ষপাতমূলক আচরণের প্রতিবাদে এই সংকেতটি ব্যবহার করেছেন? কিন্তু বর্তমান ফিফার নির্দেশিকায় সরাসরি শুধু এই সংকেত প্রদর্শনের অপরাধে কোনো কোচ বা খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড দেখানোর নিয়ম নেই। তাহলে রেফারি কেন হোসাম হাসানকে সতর্ক করলেন? এটি কি তবে রেফারির ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ, নাকি কোচকে চুপ করানোর একটি কৌশল? মিসরীয় দলের পক্ষ থেকে এই ঘটনা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ফিফাও এই বিতর্কিত হলুদ কার্ডের ব্যাপারে নিশ্চুপ। এই নীরবতা যেন পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে।
বিশ্বকাপের মতো একটি বড় মঞ্চে যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত কোটি কোটি মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে এমন রহস্যময় সংকেত ও তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় হলুদ কার্ড প্রদান ফুটবলের মান ও শৃঙ্খলাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফুটবল কেবল শারীরিক শক্তির লড়াই নয়, এটি একটি শৈল্পিক ও মানসিক লড়াই। মিসরের কোচ যে পরিস্থিতিতে এই সংকেত দেখিয়েছেন, তা তাদের ভেতরের অসহায়ত্ব এবং ক্ষোভের প্রকাশ। তারা হয়তো রেফারিকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, মাঠে যা ঘটছে তা ফুটবলের নিয়ম মেনে হচ্ছে না। বর্ণবাদবিরোধী এই সংকেতটিকে তিনি হয়তো প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে, উল্টো তাকে কার্ড দেখতে হয়েছে।
ম্যাচ শেষে মিসরের খেলোয়াড়দের কান্নার রোল এবং কোচের এই রহস্যময় আচরণ ফুটবলের অন্ধকার দিকটিই যেন উন্মোচন করল। রেফারিং বিতর্ক যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার বিষয়, তখন এমন একটি ইঙ্গিতপূর্ণ সংকেত নিশ্চিতভাবেই সেই বিতর্কে ঘি ঢেলেছে। ফুটবল বিশ্বে এখন প্রশ্ন উঠছে, তবে কি রেফারিদের ওপর আর কারও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? নাকি প্রযুক্তি ও নিয়মের বেড়াজালে বন্দি হয়ে ফুটবল তার প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলছে? হোসাম হাসানের এই সংকেতটি কি তবে আগামীর ফুটবলে কোনো বড় আন্দোলনের পূর্বাভাস? নাকি এটি কেবল একটি আবেগপ্রসূত ভুল ছিল?
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, একজন কোচ হিসেবে তিনি তার দলের খেলোয়াড়দের জন্য ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন। যখন একটি গোল বাতিল করা হয় এবং প্রাপ্য পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন একজন কোচের পক্ষে মাথা ঠান্ডা রাখা অসম্ভব। তার ‘এক্স’ সংকেতটি হতে পারে একটি নীরব চিৎকার। খেলার মাঠে রেফারি যখন সর্বেসর্বা হয়ে পড়েন, তখন খেলোয়াড় বা কোচের কাছে প্রতিবাদ জানানোর পথগুলো ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসে। সেই সংকোচিত পথের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েই হয়তো তিনি এই সংকেতটি ব্যবহার করেছিলেন।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ বিশ্বকাপে এই বিতর্কিত ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একটি নতুন অধ্যায় যোগ করল। রেফারিং, প্রযুক্তি এবং কোচের অঙ্গভঙ্গি—সব মিলিয়ে এই ম্যাচটি ফুটবলকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি বাংলাদেশ অনলাইন এই ঘটনার প্রতিটি খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণ করছে এবং ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদ আপনাদের কাছে পৌঁছে দিতে সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আশা করি, ফিফা অতিদ্রুত এই রহস্যময় সংকেত এবং হলুদ কার্ডের ঘটনার প্রকৃত কারণ ব্যাখ্যা করবে, যাতে ফুটবলের মাঠে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। মাঠের লড়াই থাকুক মাঠেই, কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো যেন হয় নিরপেক্ষ ও অবিসংবাদিত। ফুটবল আমাদের সবার, এই খেলার সম্মান রক্ষা করা প্রতিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্ব।