প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও সরকারের নিরাপত্তা নিয়ে এক গভীর উদ্বেগের সুর ফুটে উঠেছে এলডিপি চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের কণ্ঠে। বুধবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে ১১ দলীয় জোট আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে এমন কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অলি আহমেদ বর্তমান সরকারপ্রধানকে ঢাকার বাইরে রাত্রিযাপন না করার পরামর্শ দিয়ে তার নিরাপত্তা ঝুঁকি ও চারপাশের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। একজন অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে তার এই সতর্কতা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
সেমিনারে অলি আহমেদ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমান এমন সব ব্যক্তিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত, যারা সরাসরি তার শুভাকাঙ্ক্ষী নন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, তার প্রধান কাজ হওয়া উচিত সরকার ও দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিদেশি গুপ্তচরদের চিহ্নিত করে তাদের দ্রুত বের করে দেওয়া। অলি আহমেদের মতে, এই গুপ্তচররাই বর্তমান সরকারের বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং প্রতিনিয়ত দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চতুর্দিকে শত্রু রেখে কোনোভাবেই একটি দেশ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, অলি আহমেদ ১১ দলীয় জোটের অবস্থানকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য ‘প্রকাশ্য শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো সেই সব মানুষ যারা বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর পাশে অবস্থান করছেন। অলি আহমেদের ভাষায়, যারা তার পাশে আছেন, তারাই আসলে তার আসল শত্রু। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, দেশের বিভিন্ন স্তরে এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যেসব বিদেশি এজেন্ট অবস্থান করছে, তারা যেকোনো মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বড় ধরনের ক্ষতি করার সক্ষমতা রাখে। এই গভীর আশঙ্কার কারণেই তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও যাতায়াতের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকার এবং বিশেষ করে ঢাকার বাইরে রাত্রিযাপন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
বর্তমান দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং অর্থনৈতিক মন্দার বিষয়েও অলি আহমেদ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজির মতো অরাজকতা চলছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় অর্থনৈতিক অবস্থা ক্রমশই নাজুক হয়ে পড়ছে। তিনি স্পষ্টভাবে প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান অবস্থানে তার সরকার খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। অলি আহমেদ মনে করেন, সময় থাকতে কার্যকর সংস্কারমূলক উদ্যোগ না নিলে দেশের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের উচিত দেশের সংস্কারের বিষয়ে দ্রুত ও সাহসী উদ্যোগ নেওয়া। অলি আহমেদ বলেন, ইতিহাসে একজন কালজয়ী নেতা হতে চাইলে জনগণকে আস্থায় নেওয়া এবং দেশের দুর্দিনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অপরিহার্য। তিনি ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, তারা আসলে প্রধানমন্ত্রীর শত্রু নন, বরং তারা তার বন্ধু বলেই প্রকাশ্যে এই গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শগুলো দিচ্ছেন। এই ধরনের খোলাখুলি আলোচনা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করেছে, যেখানে বিরোধী পক্ষ বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাকেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার খাতিরে সতর্ক বার্তা দিতে দেখা যাচ্ছে।
অলি আহমেদের এই সতর্কবার্তা দেশের সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণত রাজনৈতিক নেতারা একে অপরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়িতে ব্যস্ত থাকেন, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টি যেভাবে একজন প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তার মুখে এসেছে, তা উপেক্ষা করার উপায় নেই। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বা গুপ্তচরদের প্রভাব নিয়ে যে আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছেন, তা তদন্ত সাপেক্ষে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোতে বাইরের হস্তক্ষেপ থাকলে তা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অলি আহমেদের এই বক্তব্য সরকারের জন্য একটি আয়না হতে পারে। যদি সরকার ও তার আশপাশের মানুষ এই পরামর্শগুলোকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে না দেখে দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে পর্যবেক্ষণ করে, তবে দেশের জন্য তা কল্যাণকর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে এক জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে দিয়ে দেশ চালাচ্ছেন, তাতে দ্বিমত নেই। কিন্তু অলি আহমেদের এই সতর্কতা যেন অদূর ভবিষ্যতে দেশের কোনো বড় সংকটের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করে, সেটিই এখন দেশবাসীর কাম্য।
পরিশেষে বলা যায়, একটি দেশের প্রধান নির্বাহীর নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা প্রতিটি নাগরিকের উদ্বেগের বিষয়। ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের এই বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক নেতা তার কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই বড় বড় সংকটে পড়েছেন। তাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও নিরাপত্তা এজেন্সিগুলোর উচিত হবে এই বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে পর্যালোচনা করা। একটি বাংলাদেশ অনলাইন দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সবসময় সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন করে আসছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে রাজনীতিবিদরা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রকে প্রাধান্য দেবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।