প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টির ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচির তৃতীয় দিনে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে এক বিশাল জনসমাবেশ ও পদযাত্রায় অংশ নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। তিনি বর্তমান শাসনব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে বলেন, আগামীর বাংলাদেশে আর কাউকে শেখ হাসিনা হতে দেওয়া হবে না। তার এই বক্তব্য গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে জনমনে সঞ্চারিত থাকা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংকল্পেরই প্রতিফলন।
সংসদে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সারজিস আলম বলেন, সংসদ ভবনের ভেতরে এমপি ও মন্ত্রীরা যেভাবে কথা বলেন, তাতে মনে হয় বাংলাদেশে কোনো বড় সমস্যা নেই। দেশের বিদ্যুৎ সংকটকে কেবল ‘মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ যাওয়া’ হিসেবে অভিহিত করার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এটিকে লোডশেডিং না বলে সমস্যার সমাধান করতে হবে। জনগণের কষ্টকে যারা অস্বীকার করেন বা লোক দেখানো কথা বলেন, তাদের উদ্দেশে সারজিস বলেন, সংসদে কেবল বাগাড়ম্বর না করে ঘরে ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাই এখন দায়িত্ব। তার এই বক্তব্যে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনকার কষ্টের চিত্র এবং শাসনের নামে অবহেলা যে ক্ষোভ তৈরি করেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
শেখ হাসিনার শাসনামলের সেই ‘সবাই খারাপ, শুধু শেখ হাসিনা ভালো’—এই আত্মঘাতী সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা আগামী দিনে আর কোনো একক ব্যক্তির এককেন্দ্রিক ক্ষমতা বা স্বৈরাচারী মানসিকতার রোগ আর হতে দেব না। বাংলাদেশে অতীতে যেভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে কাউকে অতিমানব বানিয়ে পুরো রাষ্ট্রকে কুক্ষিগত করা হয়েছিল, সেই ব্যবস্থার চির অবসান ঘটাতে জাতীয় নাগরিক পার্টি বদ্ধপরিকর বলে জানান তিনি। তার এই বক্তব্যটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রয়েছে, তাকেই আরও বেগবান করেছে। ক্ষমতা মানেই যে জনগণের সেবা করা, শাসনের দণ্ড নয়—এই সত্যটিই তিনি পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন।
দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উদ্দেশ করে সারজিস আলম বলেন, অতীতের ভুলত্রুটি কাটিয়ে আপনাদের কাজের মধ্য দিয়ে হারানো গৌরব ও সম্মান পুনরুদ্ধার করতে হবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু সেই ফাঁদে পা না দিয়ে নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখার আহ্বান জানান তিনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষায় নিজের বিবেক বিসর্জন দিলে তারা কখনো জনগণের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জন্য এটি ছিল এক বড় সতর্কবার্তা, যাতে তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
সীমান্ত পরিস্থিতি ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সারজিস আলম কোনো আপস না করার ঘোষণা দেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভবিষ্যতে যদি সীমান্তে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটে, কাউকে অন্যায়ভাবে পুশইন করা হয় কিংবা দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো হুমকি আসে, তবে সরকার কে বা তাদের অবস্থান কী ছিল—তা দেখা হবে না। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যারা লিপ্ত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে জনগণের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা থাকবেন, তাদের দেশের সীমানা এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যে প্রাথমিক দায়িত্ব, তা তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে ব্যক্ত করেন।
কালিহাতীতে অনুষ্ঠিত এই পদযাত্রা ও পথসভায় অংশ নেওয়া মানুষের ঢল ছিল চোখে পড়ার মতো। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাধারণ মানুষ সারজিস আলমের বক্তব্য শুনতে সমবেত হন। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক তুষার সরেয়ার, ডা. আতিক মুজাহিদ এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল্লাহ হায়দারসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। তাদের উপস্থিতিতেই সারজিস আলম আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়ার কর্মপরিকল্পনা ও অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরেন।
সারজিস আলমের এই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে, তা যেন কোনোভাবেই পুরনো স্বৈরাচারী ধারায় ফিরে না যায়, সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যেই এই ৩৬ দিনব্যাপী কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি তার বক্তব্যে মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সবাইকে পাশে থাকার আহ্বান জানান। দেশের প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তদারকি করা এবং জনসেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়ে নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে ধারাবাহিক তদারকি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
পরিশেষে, সারজিস আলমের কালিহাতীর সমাবেশ থেকে একটি বার্তাই স্পষ্ট হয় যে, নতুন বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের কণ্ঠস্বরই হবে সবচাইতে শক্তিশালী। তিনি যেভাবে কোনো তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিদের সমালোচনা করেছেন এবং পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, তা দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে এক নতুন ধারার সূচনা করেছে। রাষ্ট্র সংস্কার এবং মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি যে পিছপা হবে না, এই জনসভা তারই একটি স্পষ্ট ও দৃঢ় ঘোষণা। মানুষের অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলনের গতিধারা অব্যাহত থাকবে।