ভারত-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে নতুন গতি, জ্বালানি ও খনিজে মোদির ঐতিহাসিক আহ্বান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬
  • ৪২ বার
ভারত-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে নতুন গতি, জ্বালানি ও খনিজে মোদির ঐতিহাসিক আহ্বান

প্রকাশ: ০৯ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন ও সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বর্তমান অস্ট্রেলিয়া সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এক বিশাল বাঁকবদল হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেলবোর্নে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোদি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদে ‘ঐতিহাসিক’ অংশীদারত্বের ডাক দিয়েছেন। পারমাণবিক জ্বালানি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ হাইড্রোজেন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আহরণের মতো ক্ষেত্রগুলোতে দুই দেশ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে তা কেবল দুই দেশের অর্থনীতিই নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

বুধবার রাতে মেলবোর্নে পৌঁছানোর পর থেকেই মোদির এই সফরকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে অস্ট্রেলিয়া-ভারত অর্থনৈতিক রোডম্যাপ বিষয়ক ওই ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে মোদি অত্যন্ত স্পষ্ট ও দূরদর্শী ভাষায় উল্লেখ করেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সম্পদ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান বাজার ও বিনিয়োগ সক্ষমতার মিলন ঘটালে তা অভাবনীয় সাফল্য বয়ে আনবে। তিনি বিশেষ করে কম-কার্বন অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন প্রকল্প এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে অস্ট্রেলীয় বিনিয়োগকারীদের ভারতের দীর্ঘমেয়াদী অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান। ভারতের বন্দর, রেলপথ এবং নগর অবকাঠামো প্রকল্পে অস্ট্রেলীয় মূলধন ও দক্ষতার সংমিশ্রণ দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে আগামী কয়েক দশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

এই সফরের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ভারত। এই লক্ষ্য পূরণে ইউরেনিয়ামের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য, যা অস্ট্রেলিয়ার বিশাল মজুদের দিকে ভারতকে নতুন করে মনোযোগী করে তুলেছে। অন্যদিকে, চীন-কেন্দ্রিক বাণিজ্য নির্ভরতা কমিয়ে আনতে অস্ট্রেলিয়াও ভারতের মতো একটি বিশাল ও দ্রুত বর্ধনশীল বাজারের সন্ধানে রয়েছে। মেলবোর্নের অনুষ্ঠানে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম পেনশন তহবিল ‘অস্ট্রেলিয়ানসুপার’ ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে আরও ৫০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার বা প্রায় ৩৪ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যা মোদির আহবানে অস্ট্রেলীয় ব্যবসায়ীদের সাড়া দেওয়ারই ইঙ্গিতবাহী।

পারমাণবিক জ্বালানি রপ্তানি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান উদ্বেগ নিরসন এবং নতুন করে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও এই সফরের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়। ২০১৪ সালে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হলেও ইউরেনিয়াম রপ্তানির বিষয়টি এতদিন নানা শর্ত ও উদ্বেগের কারণে সীমিত ছিল। মোদি ও অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের এবারের বৈঠক সেই অনিশ্চয়তার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আলবানিজ এরই মধ্যে মোদিকে দুই দেশের মধ্যে ‘জীবন্ত সেতু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা মোদির ব্যক্তিগত নেতৃত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অস্ট্রেলীয় নেতৃত্বের গভীর আস্থার প্রতীক। ভারত বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, তবে এই নতুন অর্থনৈতিক রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হলে অদূর ভবিষ্যতে তা শীর্ষতালিকায় উঠে আসবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

মানবিক ও সামাজিক দিক থেকে এই সফরটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বিশাল সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। মেলবোর্নের একটি বিশাল স্টেডিয়ামে প্রবাসী ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে মোদির ভাষণ দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম প্রত্যাশা করা হচ্ছে। যদিও অস্ট্রেলীয় গণমাধ্যমগুলোর কিছু বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে নিরাপত্তার কঠোর কড়াকড়ির খবর জানিয়েছে, তবুও মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও প্রবাসী সম্প্রদায়ের বিশাল উপস্থিতি সব প্রতিকূলতাকে ছাপিয়ে যাবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। অতীতের যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের সফরের মতোই এবারের সমাবেশটিও দুই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক মেলবন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।

ইন্দোনেশিয়া সফর শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় আসা নরেন্দ্র মোদির এই বিদেশ সফরটি মূলত ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার একটি কৌশলগত প্রয়াস। ইন্দোনেশিয়ায় কৃষি ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্রহ্মোস ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর অস্ট্রেলিয়ায় এসে জ্বালানি ও খনিজ খাতের নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা মোদির বিদেশ নীতিতে এক নতুন সমন্বয়ের প্রতিফলন ঘটায়। শুক্রবার দুপুরে নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তিনি তার বর্তমান সফরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত অবস্থান আরও সুসংহত করে যাচ্ছেন।

পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি ও খনিজ খাতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের এই ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব কেবল দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এক নতুন বার্তাবাহী। ভারত যখন দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির পথে ছুটছে, তখন অস্ট্রেলিয়ার মতো প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধ দেশের সঙ্গ পাওয়া তাদের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। নরেন্দ্র মোদির এই সফরের সুফল কেবল বর্তমান নয়, বরং আগামী প্রজন্মের ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত মজবুত করবে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও রোডম্যাপ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে, যা ভবিষ্যতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়াকে এক নতুন অর্থনৈতিক বলয়ে ঐক্যবদ্ধ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com