শ্রমিক কর্মবিরতিতে রাজশাহীর বাস চলাচল অচল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
শ্রমিক কর্মবিরতিতে রাজশাহীর বাস চলাচল অচল

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহীর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের একাংশের কর্মবিরতির কারণে। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির ফলে রাজশাহী থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার অধিকাংশ রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী, যাদের মধ্যে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী সাধারণ নাগরিকের সংখ্যাই ছিল বেশি।

পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নতুন কমিটি গঠন, নির্বাচন আয়োজন এবং সংগঠনের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধের জের ধরেই এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ কয়েক দিন ধরে তীব্র আকার ধারণ করছিল। সোমবার সন্ধ্যায় সেই বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নেয় এবং কয়েক ঘণ্টার জন্য রাজশাহী থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে জেলা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পরিবহন নেতারা জরুরি বৈঠকে বসেন। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় সোমবার রাত প্রায় ৮টার দিকে দূরপাল্লার বাস চলাচল পুনরায় শুরু হলেও বিরোধ পুরোপুরি নিরসন হয়নি। শ্রমিকদের একটি অংশ প্রশাসনের প্রস্তাবে অসন্তুষ্ট থেকে মঙ্গলবার সকাল থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা দেয়। এর পর থেকেই রাজশাহীর বাস টার্মিনালগুলোতে কার্যত পরিবহন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।

সকালে রাজশাহী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এবং নগরীর বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ের আগেই এসে অপেক্ষা করছেন। কেউ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কেউ কর্মস্থলে যোগ দিতে কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে অন্য জেলায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। অনেকে বিকল্প পরিবহন খুঁজতে গিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে বাধ্য হন, আবার কেউ যাত্রাই বাতিল করেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, পরিবহন সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনে বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এমন কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল পরিবহনে সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাজশাহী অঞ্চল থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য ও ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন করা হয়। বাস চলাচল বন্ধ থাকলে যাত্রীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহননির্ভর ব্যবসাগুলোও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।

জেলার সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ইউনিয়নের নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে শ্রমিকদের একটি পক্ষ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তার দাবি, এরপর তারা বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তিনি অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে বহিরাগত এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থক লোকজনও ছিল বলে তাদের ধারণা। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

নজরুল ইসলাম হেলাল আরও বলেন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছেন। একই সঙ্গে ইউনিয়নের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবিও মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি ছিল বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধানই সংশ্লিষ্টদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

অন্যদিকে শ্রমিকদের কর্মবিরতির বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাস টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন যাতে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানো যায়।

বোয়ালিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুস্তারি বেগম জানিয়েছেন, সোমবারের বিরোধ এবং উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি আলোচনার মাধ্যমে অনেকটাই মীমাংসা হয়েছে। তবে মঙ্গলবারের কর্মবিরতি নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পরিবহন খাত বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ যখন গণপরিবহন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, তখন তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন সাধারণ যাত্রীরা। সংগঠনের নির্বাচন, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে, তবে সেসব সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে হওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পথ। গণপরিবহন বন্ধ হয়ে গেলে শুধু যাত্রী নয়, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হয়।

এদিকে রাজশাহীর বিভিন্ন বাস কাউন্টার ও টার্মিনালে আটকে পড়া যাত্রীরা দ্রুত সমস্যার সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই বলেন, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা কোথাও যেতে না পেরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে বিকল্প যানবাহনের অভাবে বাস টার্মিনালেই অবস্থান করেন।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ বিরোধের দ্রুত সমাধান হবে এবং বাস চলাচল স্বাভাবিক হবে। একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে অধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসন, পরিবহন মালিক, শ্রমিক নেতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে কর্মবিরতি প্রত্যাহারের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না আসায় রাজশাহীর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস চলাচল স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত