প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর অব্যাহত হামলা এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখার কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেই ইউক্রেনের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন এক অধ্যায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোকে সরিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের পার্লামেন্টে চলতি সপ্তাহেই নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, সরকারের কার্যক্রমে নতুন চিন্তা, নতুন গতি এবং আরও কার্যকর প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিশ্চিত করতেই এই রদবদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে সর্বোচ্চ দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। সে কারণেই সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যাতে যুদ্ধকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা আরও কার্যকরভাবে সম্ভব হয়।
রবিবার প্রকাশিত এক ঘোষণায় জেলেনস্কি জানান, মাত্র এক বছর দায়িত্ব পালনের পর প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সভিরিদেঙ্কোকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এরপর থেকেই ইউক্রেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। পার্লামেন্ট সদস্য, বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সম্ভাব্য কয়েকজন শক্তিশালী প্রার্থী ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন।
সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নাম রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি নাফতোগাজের প্রধান সেরহি কোরেৎসকি। পাশাপাশি জ্বালানিমন্ত্রী দেনিস শ্মিহাল এবং বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকেও প্রধানমন্ত্রীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পার্লামেন্ট সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই তিনজনের নাম উল্লেখ করে সম্ভাব্য নতুন সরকারের নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা করছেন।
জেলেনস্কি প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়ার পর সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের সঙ্গে বৈঠকের ছবিও প্রকাশ করেছেন। ইউক্রেনের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী পদে একজনকে মনোনয়ন দেন। এরপর মনোনীত প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার অধিকাংশ সদস্য নির্বাচন করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের দায়িত্ব গ্রহণের আগে সংসদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির মতে, সরকারের নতুন নেতৃত্ব ইউক্রেনকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংগ্রহে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জনের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা এবং আগামী শীতে রাশিয়ার সম্ভাব্য বিদ্যুৎ অবকাঠামো হামলার জন্য দেশকে প্রস্তুত করাও নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবস্টেশন এবং গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নাফতোগাজের প্রধান সেরহি কোরেৎস্কি প্রধানমন্ত্রী হলে জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং জরুরি সেবা পুনর্বহালে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসক হিসেবে তার অভিজ্ঞতা সরকার পরিচালনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলেও ধারণা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভও অন্যতম আলোচিত প্রার্থী। যুদ্ধকালীন বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক কর্মসূচি, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে তার ভূমিকা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, ড্রোন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং জনবল সংকট মোকাবিলায় নিয়োগব্যবস্থার সংস্কার শুরু করেন। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিলে চলমান সামরিক সংস্কার কার্যক্রমে সাময়িক ধাক্কা লাগতে পারে।
কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর মতে, সরকার পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে আরও কয়েকজন দক্ষ প্রশাসককে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। আলোচনায় রয়েছে নিয়মিত রুশ হামলার মুখে থাকা খারকিভ শহরের মেয়র ইহোর তেরেখভের নামও। যুদ্ধকালীন সংকট মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরকারে যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তবে সরকারের এই রদবদল নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিরোধী দল হলোস পার্টির আইনপ্রণেতা ইন্না সোভসুন মনে করেন, যুদ্ধ চলাকালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে ঘন ঘন পরিবর্তন সেনাবাহিনীর চলমান সংস্কার এবং কৌশলগত পরিকল্পনাকে ব্যাহত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, অতীতেও কয়েকজন মন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা শুরু করলেও দায়িত্ব পরিবর্তনের কারণে সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। একই ধরনের পরিস্থিতি আবার তৈরি হলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক হবে না।
সাবেক পার্লামেন্ট স্পিকার ও বিরোধী আইনপ্রণেতা দিমিত্রো রাজুমকভও এই রদবদল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে সীমিত সংখ্যক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ওপর নির্ভর করছে। ফলে নতুন রদবদলেও মূলত একই ব্যক্তিদের মধ্যে দায়িত্ব পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না।
বর্তমানে ইউক্রেন এমন এক সময়ে এই পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, যখন রাশিয়া দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে হামলার মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা এবং শিল্পাঞ্চলকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনও দূরপাল্লার হামলার মাধ্যমে রাশিয়ার তেল খাত ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। যুদ্ধের এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মহলেরও গভীর নজর কেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জেলেনস্কির এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যই নয়, আন্তর্জাতিক সহযোগীদের কাছে সংস্কার ও জবাবদিহির বার্তা দেওয়ার কৌশলও কাজ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে ইউক্রেনকে। এ কারণে সরকারের নতুন কাঠামো গঠনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এদিকে ইউক্রেনে চলমান তথাকথিত ‘মাইডাস’ দুর্নীতি তদন্তও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। এই তদন্তে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে এবং তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান। যদিও এ পরিস্থিতির মধ্যেও কিয়েভ ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সোসিওলজির সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্রতি জনসমর্থন গত এক বছরে মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে এবং তা প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
সামরিক আইন জারি থাকায় বর্তমানে ইউক্রেনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ফলে সরকারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের প্রধান রাজনৈতিক উপায় হিসেবে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনার সুযোগই প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন এবং পরবর্তী মন্ত্রিসভা গঠন তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং যুদ্ধ, কূটনীতি, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার সঙ্গেও এটি ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইউক্রেনের পার্লামেন্টে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী যিনিই নির্বাচিত হন না কেন, তার সামনে থাকবে যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং রাশিয়ার অব্যাহত সামরিক চাপের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন দায়িত্ব।