বন্যায় বাঁশখালীতে ৪০ হাজার মাটির ঘর বিধ্বস্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ২৯ বার
বন্যায় বাঁশখালীতে ৪০ হাজার মাটির ঘর বিধ্বস্ত

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোথাও কোথাও পানি নেমে গেলেও বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো কোমর কিংবা হাঁটুপানি জমে রয়েছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক ধসে পড়ছে কাঁচা মাটির ঘর, ভেসে উঠছে বিধ্বস্ত জনপদ, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসল এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর বাস্তব চিত্র। প্রশাসন ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় উপজেলার অন্তত ৪০ হাজার মাটির ঘর সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধসে পড়েছে। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, সড়ক যোগাযোগ এবং জনজীবনে নেমে এসেছে ব্যাপক বিপর্যয়।

স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢল, টানা ভারী বর্ষণ এবং সমুদ্রের জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাবে বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বহু পরিবার রাতারাতি বসতভিটা হারিয়েছে। মাটির তৈরি ঘরগুলো দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকায় এখন পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দেয়াল ধসে পড়ছে এবং বসতঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবার খোলা আকাশের নিচে কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি অথবা উঁচু ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

সরেজমিনে পৌরসভার আশকরিয়াপাড়া, মহাজনপাড়া, রঙিয়াঘোনা এবং বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা, রত্নপুর, চাপাছড়ী, ছনুয়া ইউনিয়নের মধুখালী, ছেলবন, জমিলাপাড়া, সাম্বলীপাড়া, তোতকখালী এবং এক নম্বরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক স্থানে বন্যার পানি কিছুটা কমেছে। তবে পানি সরে যাওয়ার পর দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকা মাটির ঘরগুলো একের পর এক ভেঙে পড়ছে। কোথাও শুধু ভাঙা দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে, কোথাও পুরো ঘরই মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। গ্রামীণ সড়কগুলোও ভেঙে গেছে কিংবা কাদায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, দুর্গত এলাকার তুলনায় ত্রাণ সহায়তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক পরিবার এখনো পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পায়নি। অনেক পরিবারের রান্নার চুলায় কয়েকদিন ধরে আগুন জ্বলেনি। ক্ষতিগ্রস্তদের ভাষ্য, পানি কমলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, এবারের বন্যা কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩৫ হাজার কৃষকের বীজতলা, আউশ ধান, বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং অন্যান্য কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু ফসল নয়, মাছ চাষেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার প্রায় আড়াই হাজার পুকুর এবং ৩১০টি চিংড়ি ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকার মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, চট্টগ্রামে চলতি বছরের বন্যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ। তাঁর মতে, অতিবর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বাঁশখালীর অধিকাংশ এলাকার মানুষ এখনো পানিবন্দি। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পুরো জেলায় মৎস্য খাতে প্রায় ৯০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে বাঁশখালীর প্রায় ৪০০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যার কারণে শুধু কৃষি ও মৎস্য নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে সহস্রাধিক গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে অথবা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। কোথাও কোথাও নৌকাই এখন মানুষের একমাত্র ভরসা। ফলে খাদ্য, ওষুধ এবং ত্রাণসামগ্রী দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও বাড়তি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

ছনুয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নুরুল আমীন ছানুবী বলেন, তাঁর ইউনিয়ন এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। এখনও বহু মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। অসংখ্য পরিবার বসতঘর হারিয়েছে এবং অনেকের ঘরে রান্না করার মতো পরিস্থিতিও নেই। তিনি বলেন, দুর্গত মানুষের তুলনায় সহায়তা এখনো অপর্যাপ্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক এলাকায় পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাহারছড়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রেজাউল করিম চৌধুরী ইউনুস মুন্সি। তিনি বলেন, পুরো ইউনিয়ন এখনো বন্যার পানির নিচে রয়েছে। সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে বিদ্যমান ত্রাণ দিয়ে সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বন্যার আরেকটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাব। অধিকাংশ নলকূপ ডুবে যাওয়ায় নিরাপদ পানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বিশুদ্ধ পানির সংকট দীর্ঘায়িত হলে ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারাও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, দুর্গত এলাকায় পানি ধীরে ধীরে কমছে এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ইতোমধ্যে ১০০ টন চাল এবং পাঁচ হাজার পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তিনি আরও জানান, দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও মাঠে কাজ করছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় ও পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাব আগের তুলনায় আরও তীব্র হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই বাঁধ, উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, দুর্যোগ-সহনশীল আবাসন এবং দ্রুত পুনর্বাসন পরিকল্পনার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বাঁশখালীর মানুষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল বন্যার পানি সরে যাওয়া নয়, বরং ভেঙে পড়া ঘর পুনর্নির্মাণ, কৃষি ও মৎস্য খাত পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নতুন করে জীবন শুরু করার শক্তি পাবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত