জুলাই যোদ্ধাদের অবহেলা আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা: শফিকুর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৩২ বার
জুলাই যোদ্ধাদের অবহেলা আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা: শফিকুর

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গে আয়োজিত বিশেষ সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও পঙ্গু যোদ্ধাদের অবহেলা করা শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং জাতির আত্মার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। তাঁর মতে, দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল হিসেবে অর্জিত এই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বাস্তবায়নে সরকার প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং তৎকালীন গণহত্যার বিচারসংক্রান্ত বিশেষ আলোচনায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম, গুম, নির্যাতন, হত্যা এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। সেই আন্দোলনে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, গুম হয়েছেন অথবা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাঁদের ভুলে যাওয়া জাতির নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ড. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, আন্দোলনের চেতনার কথা মুখে বলা হলেও বাস্তবে অনেক আহত জুলাই যোদ্ধাকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। তিনি বলেন, যাঁদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই। সরকারের উচিত দ্রুত আহত ও পঙ্গু যোদ্ধাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা।

সংসদে বক্তব্যের সময় তিনি বলেন, প্রয়োজনে জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা কমিয়ে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা যেতে পারে। তিনি জানান, এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে নিজের সংসদীয় সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করতেও তিনি প্রস্তুত।

বিরোধীদলীয় নেতা সরকারের সমন্বয়হীনতা এবং ধীরগতির সমালোচনা করে বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর এখনো পুরোপুরি জনগণের জন্য উন্মুক্ত না হওয়ায় মানুষ হতাশ। তাঁর মতে, কিছু সংস্কার কাজ চলমান থাকলেও জাদুঘরটি জনগণের জন্য খুলে দেওয়া যেত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দ্রুত জাদুঘরটি উদ্বোধন এবং জনগণের জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানান।

একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘ সময় ধরে বেতন না পাওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং আহতদের সহায়তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

জুলাই গণহত্যার বিচার প্রসঙ্গেও সরকারকে কড়া বার্তা দেন ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এ বিচার নিয়ে কোনো ধরনের গড়িমসি, ধীরগতি কিংবা রাজনৈতিক আপস জনগণ মেনে নেবে না। তিনি বলেন, বিচার অবশ্যই আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে হতে হবে। একই সঙ্গে নির্দোষ কোনো ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার না হন, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

সংসদে তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সময় যেসব সংবাদমাধ্যম স্বৈরাচারী শাসনকে সমর্থন দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের ভূমিকা নিয়েও সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, যারা অতীতে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালিয়ে সহিংসতা উসকে দিয়েছে, তাদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

দেশের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সীমান্তে উসকানিমূলক বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে সরকারের আরও দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের মানুষ সবসময় ঐক্যবদ্ধ থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান। বিশেষ করে আন্দোলনের ইতিহাস, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় সবাইকে আরও সংযত ও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অসতর্ক মন্তব্য অনেক সময় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এ ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জনগণের ভোট ও মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়বে। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের প্রত্যাশা ও গণরায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে ড. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন, বিচার প্রক্রিয়ার গতি, স্মৃতি সংরক্ষণ এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থানও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তবে এসব বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের অগ্রগতি আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত