পানি নামতেই লোহাগাড়ায় উন্মোচিত বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৪৩ বার
পানি নামতেই লোহাগাড়ায় উন্মোচিত বন্যার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি

প্রকাশ: ১৫ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার পর চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার অধিকাংশ প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে এসেছে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র। ভেঙে পড়েছে শতাধিক বসতঘর, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, সেতু, কৃষিজমি, মৎস্য খামার ও প্রাণিসম্পদ। বহু পরিবার এখনো ঘরহীন অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছে উপজেলা প্রশাসন।

স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েক দিন পানির নিচে ছিল। নিম্নাঞ্চলের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন এবং কয়েক হাজার মানুষ আশ্রয় নেন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে। বর্তমানে পানি ধীরে ধীরে নেমে যাওয়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অধিকাংশ পরিবার নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু বাড়িতে ফিরে অনেকেই দেখছেন, ঘরের আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও গৃহস্থালির সামগ্রী পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও আবার ঘরের দেয়াল ধসে পড়েছে, কোথাও বসতঘর সম্পূর্ণ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

বন্যার কারণে কয়েক দিন কর্মহীন হয়ে পড়েন রিকশাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্নআয়ের মানুষ। ফলে অনেক পরিবার খাদ্যসংকট ও আর্থিক দুরবস্থার মুখে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, পানি নেমে গেলেও তাদের জীবনে দুর্ভোগ শেষ হয়নি। বরং এখন শুরু হয়েছে নতুন করে ঘরবাড়ি মেরামত, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার কঠিন সংগ্রাম।

উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে শতাধিক পরিবারের বসতঘর ধসে পড়েছে। কয়েক লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্যোগের সময় উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হলেও অনেক পরিবার দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।

কৃষি ও মৎস্য খাতেও বন্যার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নয়টি ইউনিয়নে প্রায় ১ হাজার ৬২০টি পুকুর, দিঘি ও মাছের প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি ২৬২ হেক্টর আয়তনের মাছের ঘের প্লাবিত হয়ে বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে শুধু মৎস্য খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৮ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কৃষি বিভাগের প্রাথমিক মূল্যায়নে প্রায় ৫০০ হেক্টর কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধান, সবজি ও মৌসুমি ফসলের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলজ গাছও নষ্ট হয়েছে। কৃষকদের অনেকে জানিয়েছেন, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন তারা। কিন্তু বন্যার পানিতে পুরো বিনিয়োগই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই হাজার পোলট্রি খামার এবং দেড় হাজার গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে খামারিদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।

অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির চিত্রও উদ্বেগজনক। উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আধুনগর, আমিরাবাদ, পদুয়া, লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ৩৪টি সড়ক, সাতটি সেতু ও কালভার্ট এবং প্রায় ৩২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অবকাঠামো মেরামতে অন্তত ১৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক এলাকায় ভাঙা রাস্তা ও ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর কারণে এখনো যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি।

ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খামারি মঞ্জুর আলম বলেন, প্রবল স্রোতে তার মাছের প্রকল্প থেকে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। তিনি জানান, সরকারি সহায়তা না পেলে নতুন করে মাছ চাষ শুরু করা তার পক্ষে সম্ভব হবে না। একই ধরনের দুর্দশার কথা জানিয়েছেন চুনতি ইউনিয়নের বাসিন্দা সফর। তিনি বলেন, বন্যার পানিতে তার বসতঘর ভেঙে গেছে। অর্থাভাবে এখনো ঘর সংস্কার করতে পারেননি। ফলে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে অন্যের বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

আধুনগর এলাকার বাসিন্দা আবুল কালামও একই দুর্ভোগের কথা জানান। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টির পানিতে তার বাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন পার করছেন তিনি।

আধুনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দীন বলেন, বন্যায় অর্ধশতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় দেড় হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘর পুনর্নির্মাণে সরকারি সহায়তা জরুরি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কার এবং কৃষকদের জন্য আর্থিক ও উপকরণভিত্তিক প্রণোদনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বায়েজীদ বিন আখন্দ জানিয়েছেন, উপজেলার সব ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে দুর্গত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। যেসব পরিবারের ঘরবাড়ি ধসে গেছে, তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। তাই শুধু জরুরি ত্রাণ নয়, টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

লোহাগাড়ার মানুষ এখন বন্যার পানি নামার পর নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। অনেকেই ঘর হারিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। তাদের প্রত্যাশা, জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি দ্রুত পুনর্বাসন, কৃষি ও মৎস্য খাতে প্রণোদনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ করে দেবে সরকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত