বিএফআইইউ: ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ২৬ বার
বিএফআইইউ: ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের আর্থিক খাত, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং অবৈধ সম্পদ উদ্ধারের কার্যক্রমে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর নামে দেশে ও বিদেশে মোট প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ আদালতের আদেশে জব্দ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে এবং চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে আরও ইতিবাচক অগ্রগতির আশা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির প্রধান ইখতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনার ভিত্তিতে এ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন দেশে থাকা আরও প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদও সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জব্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে-বিদেশে জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা।

বিএফআইইউ প্রধান জানান, অর্থপাচারের মাধ্যমে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তার ভাষায়, দেশের সম্পদ অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে আনার জন্য আইনগত ও কূটনৈতিক সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বছরের শেষ নাগাদ বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে জনগণকে আরও ইতিবাচক খবর জানানো সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অর্থপাচার প্রতিরোধে বিএফআইইউ কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয় বা গোষ্ঠী বিবেচনায় নেয় না। সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন, অস্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম কিংবা অর্থপাচারের প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয় এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত শুরু হয়। তিনি আরও বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও যদি একই ধরনের অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইখতিয়ারউদ্দিন মো. মামুনের বক্তব্যে উঠে আসে যে, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখাই বিএফআইইউর মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করে। সংস্থাটি প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে অর্থপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ বিভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও বাস্তবায়ন করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধার একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়া। এ ধরনের সম্পদ ফেরত আনতে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে সম্পদ জব্দ হওয়া যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, তেমনি সেই সম্পদ চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনতে আরও সময় এবং বহুমাত্রিক আইনি প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থপাচার একটি দেশের অর্থনীতির ওপর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাই অর্থপাচার রোধের পাশাপাশি বিদেশে চলে যাওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিএফআইইউ প্রধানের বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সংস্থাটি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং তথ্য-প্রমাণ ও আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে আলাদা নীতি অনুসরণ করা হয় না। এই অবস্থান আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে এ ধরনের বিষয়ে আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, আদালতের মাধ্যমে সম্পদ জব্দ করা এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অপরাধ প্রমাণ হওয়া এক বিষয় নয়। জব্দকরণ সাধারণত চলমান তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে করা হয়। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ভিত্তিতেই সম্পদের মালিকানা, বাজেয়াপ্তকরণ বা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বিএফআইইউর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সংস্থাটির কর্মকর্তারা দেশের আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে চলমান উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের বিষয়েও আলোকপাত করেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, আগামী সময়ে অর্থপাচার প্রতিরোধ ও অবৈধ সম্পদ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত