প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে দৃঢ় আগ্রহ প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজীকরণ, আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পারস্পরিকভাবে লাভজনক বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে দেশটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে সম্ভাবনা সৌদি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বুধবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বিনিয়োগ ভবনে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বৈঠকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর সঙ্গে সৌদি আরবের পরিবহন ও লজিস্টিকস উপমন্ত্রী ড. রুমাইহ মোহাম্মদ আল-রুমাইহের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। বিডার প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৈঠকে উভয় পক্ষ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
বৈঠকে সৌদি উপমন্ত্রী ড. রুমাইহ মোহাম্মদ আল-রুমাইহ বলেন, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং ব্যবসা সহজীকরণে সরকার যে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা সৌদি আরবের নিজস্ব অর্থনৈতিক রূপান্তর কৌশল ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম সহজ করার উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
তিনি আরও জানান, সৌদি আরব বর্তমানে নিজেকে একটি বৈশ্বিক লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এই লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসেবে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন খাতে সৌদি প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে সরকার নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিচ্ছে। বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবহন, বন্দর, সরবরাহ ব্যবস্থা ও সামুদ্রিক খাতে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশই লাভবান হতে পারে।
আলোচনায় বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে সৌদি-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)-এর কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সৌদি উপমন্ত্রী জানান, প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে বর্তমানে ৯৮ শতাংশেরও বেশি কর্মী বাংলাদেশি। এটি শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না, বরং আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন ব্যবস্থা দেশের সামুদ্রিক লজিস্টিকস খাতে যুক্ত করছে।
তিনি বলেন, আরএসজিটি ভবিষ্যতেও বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহী। বিশেষ করে বন্দর ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিকস সেবা নিশ্চিত করতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, আলোচনায় এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে সৌদি আরবের আগ্রহ বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক, কোল্ড স্টোরেজ অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন, গুদাম ব্যবস্থাপনা, আর্থিক সেবা এবং বাণিজ্য সহায়ক অবকাঠামো খাতে যৌথ বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ, বৃহৎ ভোক্তা বাজার, দক্ষ জনশক্তি এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিডা ইতোমধ্যে সৌদি আরবের একাধিক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রকল্প চিহ্নিত করা, তথ্য সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ এবং বিডার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ের মাধ্যমে বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগ সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। জ্বালানি, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শিল্প খাতে সৌদি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে তা বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্যও সৌদি আরবের বৃহৎ বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। উন্নত বন্দর, কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থা, আধুনিক গুদামজাতকরণ এবং দ্রুত পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমে, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়। এই বাস্তবতায় সৌদি আরবের বিনিয়োগ আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ বর্তমান ইতিবাচক অগ্রগতিকে কাজে লাগিয়ে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে পারস্পরিকভাবে লাভজনক বিনিয়োগ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই আলোচনার ধারাবাহিকতায় পরিবহন, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন ও সামুদ্রিক অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সৌদি বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হবে এবং দুই দেশের কৌশলগত অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করবে।