৬১৬ কোটিতে বিক্রি টি.রেক্স কঙ্কাল, বিশ্বরেকর্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৮ বার
৬১৬ কোটিতে বিক্রি টি.রেক্স কঙ্কাল, বিশ্বরেকর্ড

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ডাইনোসরের জীবাশ্ম শুধু বিজ্ঞানীদের গবেষণার উপকরণই নয়, বরং এটি এখন আন্তর্জাতিক সংগ্রাহক ও নিলাম বাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি বছর আগের পৃথিবীর ইতিহাস বহনকারী এসব জীবাশ্মের প্রতি আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। সেই আগ্রহেরই নতুন এক নজির তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। নিউইয়র্কে আন্তর্জাতিক নিলাম প্রতিষ্ঠান সোদেবিজের আয়োজিত এক নিলামে ‘গাস’ নামে পরিচিত একটি টাইরানোসরাস রেক্স (টি.রেক্স) ডাইনোসরের কঙ্কাল বিক্রি হয়েছে ৫ কোটি ১ লাখ মার্কিন ডলারে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬১৬ কোটি টাকার সমান। এই বিক্রির মধ্য দিয়ে নিলামে বিক্রি হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে দামি ডাইনোসরের কঙ্কালের নতুন রেকর্ড গড়েছে ‘গাস’।

মঙ্গলবার নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত নিলামকে ঘিরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংগ্রাহক, গবেষক এবং প্রাকৃতিক ইতিহাসে আগ্রহীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। নিলামের শুরু থেকেই কঙ্কালটি কেনার জন্য একাধিক ধনী সংগ্রাহক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত সাতজন সম্ভাব্য ক্রেতার মধ্যে প্রায় ১০ মিনিট ধরে টানা দর হাঁকার লড়াই চলে। প্রতিযোগিতা যত এগোয়, কঙ্কালটির দাম ততই বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত এক অজ্ঞাতপরিচয় ক্রেতা ৫ কোটি ১ লাখ মার্কিন ডলারে এটি কিনে নেন। তবে ক্রেতার পরিচয় প্রকাশ করেনি সোদেবিজ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘গাস’ শুধু একটি ডাইনোসরের কঙ্কাল নয়; এটি পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক জীববৈচিত্র্যের এক অমূল্য নিদর্শন। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে সম্পূর্ণ টাইরানোসরাস রেক্স কঙ্কালগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এতে মোট ১৮৩টি জীবাশ্মে পরিণত হওয়া হাড় রয়েছে এবং পুরো কঙ্কালের প্রায় ৬৩ শতাংশ এখনো অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত আছে। এই মাত্রার সংরক্ষিত কঙ্কাল বিশ্বে খুবই বিরল।

আকারের দিক থেকেও ‘গাস’ অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। কঙ্কালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৮ ফুট বা ১১ দশমিক ৬ মিটার। বিশাল আকৃতির এই টি.রেক্সকে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত বৃহত্তম নমুনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করছেন গবেষকেরা। জীবাশ্মবিদদের মতে, এমন আকার ও সংরক্ষণমানের কঙ্কাল বিজ্ঞানী এবং জাদুঘরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

‘গাস’-এর আবিষ্কারের ঘটনাও কম চমকপ্রদ নয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের একটি গরুর খামারে কঙ্কালটির সন্ধান পাওয়া যায়। পরবর্তীতে দীর্ঘ গবেষণা, খনন এবং সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি উদ্ধার করা হয়। বিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করে ধারণা করেন, এই ডাইনোসরটি আজ থেকে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত। সে সময় পৃথিবীর জলবায়ু বর্তমানের তুলনায় অনেক বেশি উষ্ণ ছিল এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিস্তীর্ণ উপকূলীয় সমভূমি ও জলাভূমি ছিল সেই সময়ের পরিবেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বিশ্বজুড়ে ডাইনোসরের জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সংগ্রাহকদের আগ্রহও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরল জীবাশ্মের আন্তর্জাতিক বাজার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ধনী সংগ্রাহক, জাদুঘর এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এখন বিরল জীবাশ্ম সংগ্রহে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। এর ফলে নিলামে এসব জীবাশ্মের দামও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

তবে এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন অনেক জীবাশ্মবিদ ও গবেষক। তাঁদের মতে, বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীবাশ্ম ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গেলে গবেষণা, শিক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রদর্শনের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই এসব মূল্যবান নমুনা ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষিত থাকায় আন্তর্জাতিক গবেষকেরা সেগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা করার সুযোগ পান না। ফলে পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য উদঘাটনের সম্ভাবনাও কমে যেতে পারে।

নিলামের আগে সংবাদ সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোদেবিজের বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগের প্রধান ক্যাসান্দ্রা হ্যাটন বলেন, বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই এমন একটি দেশ, যেখানে ব্যক্তিগত জমিতে পাওয়া জীবাশ্মের মালিকানা জমির মালিকের কাছেই থাকে। ফলে কোনো ব্যক্তি নিজের জমিতে ডাইনোসরের জীবাশ্ম খুঁজে পেলে আইনগতভাবে সেটির মালিকানা তাঁরই হয় এবং তিনি চাইলে সেটি বিক্রি করতে পারেন। তাঁর মতে, এই আইনই যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত জীবাশ্ম সংগ্রহের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।

ডাইনোসরের জীবাশ্ম বিক্রির ইতিহাসে এর আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ‘এপেক্স’ নামের একটি স্টেগোসরাসের কঙ্কালের দখলে। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হেজ ফান্ড খাতের ধনকুবের কেন গ্রিফিন এটি ৪ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলারে কিনেছিলেন। সেই বিক্রি সে সময় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ‘গাস’ সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করল।

টাইরানোসরাস রেক্স পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী মাংসাশী ডাইনোসর হিসেবে পরিচিত। বিশাল মাথা, শক্তিশালী চোয়াল এবং ধারালো দাঁতের কারণে এটি কোটি কোটি বছর আগে খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষ শিকারি ছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, একটি পূর্ণবয়স্ক টি.রেক্স এক কামড়েই বিপুল পরিমাণ শক্তি প্রয়োগ করতে পারত, যা তাকে সেই সময়ের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীদের অন্যতম করে তুলেছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘গাস’-এর মতো বিরল কঙ্কালের আবিষ্কার শুধু সংগ্রাহকদের জন্য নয়, পৃথিবীর বিবর্তন, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাগৈতিহাসিক পরিবেশ সম্পর্কে নতুন গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তাঁরা মনে করেন, এমন অমূল্য জীবাশ্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ এবং গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নিউইয়র্কের এই নিলাম আবারও প্রমাণ করেছে যে ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং সংগ্রহশালার মূল্যবান নিদর্শনগুলো এখন বৈশ্বিক শিল্প ও সংগ্রহ বাজারেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোটি কোটি বছরের পুরোনো একটি জীবাশ্মের জন্য ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয় করার ঘটনা শুধু নতুন একটি আর্থিক রেকর্ডই নয়, বরং প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীকে ঘিরে মানুষের অমলিন কৌতূহল এবং আগ্রহেরও শক্তিশালী প্রতিফলন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত