প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে কানাডার সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই লক্ষ্য সামনে রেখে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কারিগরি সহযোগিতা, গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময়, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বাস্তবায়নের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত আরও আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও রপ্তানিমুখী হয়ে উঠবে।
মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) কানাডার রাজধানী অটোয়ায় কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সির (সিএফআইএ) প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন। বৈঠকে কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সির মহাপরিচালক ড. পার্থি মুথুকুমারাসামি এবং সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান এবং উপপরিচালক মো. শরিফুল হক। বৈঠকে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতের বর্তমান অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
বৈঠকে প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন, প্রাণিস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, ভেটেরিনারি সেবা, পশুখাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, রোগ পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি, গবেষণা কার্যক্রম এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদণ্ড বাস্তবায়নের মাধ্যমে খাদ্য, প্রাণী ও উদ্ভিদস্বাস্থ্য সুরক্ষায় যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ আগ্রহ প্রকাশ করে।
আলোচনায় প্রাণিজ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণও বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের উৎপাদিত নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য ও অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও মতবিনিময় হয়। একই সঙ্গে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন, খাদ্য পরিদর্শন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করতে উন্নত প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং দক্ষ জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সির কারিগরি সহযোগিতা বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা এখন শুধু জনস্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান শর্ত। ফলে বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে কানাডিয়ান ফুড ইনস্পেকশন এজেন্সির মহাপরিচালক ড. পার্থি মুথুকুমারাসামি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণিস্বাস্থ্য এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে সহযোগিতার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় আরও বিস্তৃত করার বিষয়ে তারা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের অংশীদারিত্ব দুই দেশের জন্যই উপকারী হবে এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উন্নত পরীক্ষাগার স্থাপন, রোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিক করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা অপরিহার্য।
তাঁদের মতে, কানাডার মতো উন্নত দেশের সঙ্গে কারিগরি সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে ভেটেরিনারি সেবা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, ল্যাবরেটরি সক্ষমতা, খাদ্য পরিদর্শন এবং মান নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্তিশালী করবে।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, প্রাণিস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। পাশাপাশি তথ্য ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, গবেষণা সহযোগিতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আশাবাদও ব্যক্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অটোয়ায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠক বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যে প্রাণিসম্পদ ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর ধারাবাহিকতায় যৌথ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাণিজ পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে এবং দেশের রপ্তানি সক্ষমতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।