প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর উত্তরায় আবারও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে তারা সড়কে অবস্থান নেন। আন্দোলনের কারণে উত্তরার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে এবং যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বুধবার বেলা দেড়টার দিকে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ঢাকামুখী ও গাজীপুরমুখী উভয় দিকের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় আশপাশের সড়কগুলোতেও। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগীবাহী যান এবং সাধারণ যাত্রীরা দীর্ঘ সময় আটকা পড়ে ভোগান্তিতে পড়েন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বন্যা, টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি কিংবা চরম প্রতিকূল পরিবেশে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাই সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, দেশের যেসব এলাকায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রভাব এখনো কাটেনি, সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত রাখা। পাশাপাশি গত ১৩ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা বা সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষা দিতে ব্যর্থ শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করা।
আন্দোলনস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেন। পুলিশ জলকামানসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাখতে সংযত ভূমিকা পালন করে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে জড়াতে চান না এবং আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এর আগে মঙ্গলবারও একই দাবিতে উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। টানা দ্বিতীয় দিনের এই কর্মসূচিতে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, অবরোধের প্রভাব রাজধানীর অন্যান্য সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে এবং বিকল্প পথেও যানজটের সৃষ্টি হয়।
এদিকে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন নিজের একটি মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, গত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষাটি পুনরায় নেওয়া হবে। জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, পদার্থবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যা পরীক্ষার সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছিল এবং অনেক পরীক্ষার্থী দুর্ভোগের মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের স্থগিত পরীক্ষার সময়সূচির সঙ্গে সমন্বয় করে পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, তার ব্যক্তিগত মন্তব্যে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছেন। তিনি দাবি করেন, কাউকে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান এবং আশ্বাস দেন, যেখানে প্রশাসনিক বা প্রাকৃতিক কারণে পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সরকার শুরু থেকেই সারাদেশের পরীক্ষা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যেসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাধীন জেলাগুলোতে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে এবং পরে নতুন তারিখে নেওয়া হবে। কোনো কেন্দ্রে পানি উঠে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বিকল্প কেন্দ্র নির্ধারণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি, বাস্তবে অনেক এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল ছিল যে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তারা বলছেন, শুধু কিছু পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; দেশের সব ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অনেক শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার হবে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জাতীয় পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। এ কারণে পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর সমন্বয়ের ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেছেন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী, উত্তরায় আন্দোলন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণে কার্যকর ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তারা আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।