হরমুজে ২০% টোল: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে নতুন বৈশ্বিক বিতর্ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
হরমুজে ২০% টোল: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে নতুন বৈশ্বিক বিতর্ক

প্রকাশ: ১৫ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ টোল বা ফি আরোপের ঘোষণা দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, সামুদ্রিক আইন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ককেই আরও জটিল করবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যুদ্ধবিরতির চেষ্টা এবং পাকিস্তরের মধ্যস্থতায় সমঝোতার উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যয় মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র ২০ শতাংশ টোল আদায় করবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে মার্কিন সামরিক বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যয় বহন করতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অংশগ্রহণ ন্যায়সংগত। একই সঙ্গে তিনি জানান, ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরও জোরদার করা হবে এবং প্রয়োজন হলে সামরিক চাপও বাড়ানো হবে।

তবে এই ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের ভেতর থেকেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এর আগে প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, কোনো আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে টোল আরোপ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ, যেখানে অবাধ নৌ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে ট্রাম্পের নতুন অবস্থান প্রশাসনের পূর্ববর্তী অবস্থানের সঙ্গে স্পষ্ট সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এখানে অতিরিক্ত টোল আরোপ করা হলে পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। বড় আকারের একটি তেলবাহী ট্যাংকারের ক্ষেত্রে কয়েক কোটি ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় যোগ হতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, যদি ঘোষিত টোল কার্যকর করা হয়, তাহলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। জ্বালানির পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাবে, যার ফলে বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।

এদিকে ইরান ট্রাম্পের ঘোষণাকে কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আগে নিজেই আন্তর্জাতিক জলপথে টোল আরোপের বিরোধিতা করেছিল। এখন একই ধরনের ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প নিজেই নিজের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আচরণ করছেন। তিনি ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেন, যদি নিরাপত্তার বিনিময়ে কোনো ফি আদায়ের প্রশ্ন ওঠে, তাহলে ইরানও দাবি করতে পারে যে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা তারাই নিশ্চিত করছে।

ইরানি কর্মকর্তারা আরও দাবি করেছেন, চলমান সংঘাতের কারণে প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে এবং এর দায় মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সময়ে ইরান ও ওমান যৌথভাবে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে ফি আদায়ের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। যদিও সেই প্রস্তাব এখনো আনুষ্ঠানিক রূপ পায়নি।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। সেখানে জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো বাধ্যতামূলক টোল নেই। কেবল নির্দিষ্ট সেবা, যেমন টাগবোট সহায়তা বা নৌ-নির্দেশনা প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট জাহাজকে ফি দিতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক আইন এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে ট্রাম্পের প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত বার্তাও বহন করছে। ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থান তুলে ধরতেই এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে তারা মনে করছেন। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক আলোচনায় চাপ সৃষ্টির একটি কৌশলও হতে পারে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন সামরিক সংঘাতের বিস্তার নিয়ে। তাদের মতে, টোলের আর্থিক প্রভাবের চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

বিশ্ব অর্থনীতি যখন এখনো বিভিন্ন সংকটের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তখন হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন এই বিতর্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক আইন, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার ওপর। ফলে ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ শতাংশ টোল কার্যকর হবে কি না, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, তেমনি এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশ্বজুড়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত