স্কুল বাসে ট্রেনের ধাক্কা, পশ্চিমবঙ্গে নিহত ৩

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৩১ বার
স্কুল বাসে ট্রেনের ধাক্কা, পশ্চিমবঙ্গে নিহত ৩

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় শুক্রবার সকালে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক সড়ক-রেল দুর্ঘটনায় দুই স্কুলশিক্ষার্থী ও বাসচালক নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, যাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সকালবেলায় স্কুলগামী শিশুদের নিয়ে বাসটি একটি রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় নিমতিতা-কাটোয়াগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দমুখর একটি সকাল পরিণত হয় শোকাবহ ঘটনায়।

স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল প্রায় ৭টার দিকে বহরমপুর এলাকার কর্ণসুবর্ণ রেলক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি ট্রেন রেললাইন অতিক্রম করার পর রেলক্রসিংয়ের গেট খুলে দেওয়া হয়। এ সময় স্কুলবাসটি শিক্ষার্থীদের নিয়ে রেললাইন পার হওয়ার চেষ্টা করলে বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা নিমতিতা-কাটোয়াগামী আরেকটি লোকাল যাত্রীবাহী ট্রেন বাসটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় বাসটি কয়েক মিটার দূরে ছিটকে যায় এবং এর সামনের অংশ সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে যায়।

দুর্ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাসের ভেতরে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের আর্তচিৎকারে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দারা, রেলকর্মী এবং উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে আহতদের দ্রুত বাস থেকে বের করে নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠান। ঘটনাস্থলের দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। রেললাইনের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বাসের ভাঙা অংশ, বই-খাতা, স্কুলব্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সামগ্রী। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ছুটে আসেন শিক্ষার্থীদের উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।

প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, এই দুর্ঘটনায় বাসচালক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। পাশাপাশি বাসে থাকা দুই শিক্ষার্থীও নিহত হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। নিহতদের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজ শুরু করেছে প্রশাসন।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পুলিশ, রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান তদারকি করেন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি সরিয়ে রেল চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিছু সময়ের জন্য ওই রুটে ট্রেন চলাচল ব্যাহত হলেও পরে ধাপে ধাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

ঘটনার পরপরই কর্ণসুবর্ণ রেলক্রসিংয়ে দায়িত্ব পালনকারী গেটম্যানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, একটি ট্রেন চলে যাওয়ার পর গেট খুলে দেওয়া হলেও বিপরীত দিক থেকে আরেকটি ট্রেন আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে গেট খোলা হওয়া বড় ধরনের অবহেলার ইঙ্গিত বহন করে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে রেল কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্ত শেষে দায়িত্বে থাকা গেটম্যান এবং একজন সুপারভাইজারকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। পাশাপাশি পুরো ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে।

রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কাটোয়া থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দূরে কর্ণসুবর্ণ স্টেশনের কাছে দুর্ঘটনাটি ঘটে। তিনি বলেন, কী পরিস্থিতিতে বাসটি রেললাইন অতিক্রম করছিল এবং রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে গেটম্যানের দায়িত্ব পালন, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, ট্রেন চলাচলের সময়সূচি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

এদিকে, দুর্ঘটনার খবর প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কংগ্রেস নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, যদি গেটম্যানের অবহেলার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, জননিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো ধরনের গাফিলতি গ্রহণযোগ্য নয় এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে রেলক্রসিং ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতে প্রতিবছর রেলক্রসিংয়ে অসতর্কতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা মানবিক ভুলের কারণে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যস্ত সড়কসংলগ্ন রেলক্রসিংগুলোতে স্বয়ংক্রিয় গেট, আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করা হলে এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে যানবাহন চালকদেরও রেললাইন পার হওয়ার আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, স্কুলগামী শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত ছিল। সামান্য অসতর্কতা কিংবা দায়িত্বে অবহেলার কারণে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনরা তাদের অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই দুর্ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভারতের রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা হবে না। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর রাখছে।

এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, রেলক্রসিংয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামান্য অবহেলাও কত বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে স্কুলশিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্তে প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত