আইএমএফের পূর্বাভাস, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ৭০ বার
আইএমএফের পূর্বাভাস, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির সর্বশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ। এই পূর্বাভাস সরকারের নির্ধারিত সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক এবং সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেওয়া পূর্বাভাসের মধ্যেও অন্যতম সতর্ক মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পাঁচ দিনের ঢাকা সফর শেষে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইএমএফ জানায়, রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে সীমিত রাখতে পারে। তবে যথাযথ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে মধ্যমেয়াদে অর্থনীতির সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হতে পারে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি।

আইএমএফের এই পূর্বাভাস এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে সম্প্রতি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। ফলে আইএমএফের সর্বশেষ পূর্বাভাস দেশের অর্থনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগেরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংস্থাটির মতে, বর্তমান রাজস্ব কাঠামো ও ব্যাংকিং খাতের চাপ যদি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকে, তাহলে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে কার্যকর রাজস্ব সংস্কার, কর আদায় বৃদ্ধি, আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করতে সক্ষম হলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।

নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য আইএমএফের প্রতিনিধি দল গত ১২ জুলাই ঢাকায় আসে। সফরের শেষ দিনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সমাপনী বৈঠকে অংশ নেয় প্রতিনিধি দল। সফরকালে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সংস্কার কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে আইএমএফ জানায়, বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আগামী কয়েক মাস আলোচনা চলবে। এ আলোচনায় সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ, সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচটি কিস্তি গ্রহণের পর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সেই কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছিল।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচির ভিত্তি ও কাঠামো নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ এমনভাবে পরিচালিত হবে যাতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার ও সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ঢাকা সফরে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির কর্মকর্তা ইভো ক্রজনার। সফর শেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার এবং সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। এই তথ্যসংগ্রহমূলক সফরের মাধ্যমে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। তিনি জানান, নতুন সম্ভাব্য কর্মসূচির পরিধি, ঋণের আকার এবং সংস্কার অঙ্গীকার নিয়ে আগামী মাসগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

ইভো ক্রজনারের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে রাজস্ব সংগ্রহ, আর্থিক খাত এবং মূল্যস্ফীতিসহ একাধিক বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়ছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ বাড়লেও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এখনও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এবং খেলাপি ঋণের চাপ এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কার্যকর সংস্কার জরুরি বলে মনে করছে আইএমএফ।

সংস্থাটি মনে করে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন ব্যয় অব্যাহত রাখতে হলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে এবং রাজস্ব আহরণে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও যৌক্তিক করা এবং সেই সংস্কারের প্রভাব থেকে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি জোরদার করার সুপারিশ করা হয়েছে।

আইএমএফ আরও বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে কঠোর মুদ্রানীতি ও বিচক্ষণ রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এবারের আলোচনা মূলত ২০২৫ সালের আর্টিকেল-৪ পরামর্শ প্রতিবেদনে চিহ্নিত নীতিগত অগ্রাধিকারকে ভিত্তি করে হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে সার ও বিদ্যুতের ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে ধাপে ধাপে মূল্য সমন্বয়ের কৌশল গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ টেকসই রাখতে বিদ্যমান প্রণোদনা নীতির ধাপে ধাপে পুনর্মূল্যায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস এবং সরকারের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকলেও অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থনীতির বাস্তব চিত্র। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়ন বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন সতর্কবার্তা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের গুরুত্বও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। আগামী কয়েক মাসে সরকার ও আইএমএফের মধ্যে সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অগ্রগতি দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com