কুমিরবেষ্টিত কারাগার পরিকল্পনায় নতুন বিতর্কে ইসরাইল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯ বার
কুমিরবেষ্টিত কারাগার পরিকল্পনায় নতুন বিতর্কে ইসরাইল

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য কুমিরবেষ্টিত একটি উচ্চ-নিরাপত্তা কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। নিরাপত্তা জোরদার এবং কারাগার থেকে পালানোর ঝুঁকি কমানোর যুক্তি তুলে ধরে তিনি যে পরিকল্পনা সামনে এনেছেন, তা ইতোমধ্যেই মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রস্তাবটি এখনও বাস্তবায়নের পর্যায়ে না গেলেও ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষ (আইপিএস) এর সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে বলে হিব্রু ভাষার একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেন-গভির তার পরিকল্পনার নাম দিয়েছেন ‘অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ’। নামটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এভারগ্লেডস জলাভূমি অঞ্চলের একটি উচ্চ-নিরাপত্তা কারাগারের ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। ওই অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে অ্যালিগেটরের উপস্থিতি থাকায় সেটিকে নিরাপত্তার একটি অতিরিক্ত স্তর হিসেবে দেখা হয়। সেই ধারণাকে সামনে রেখেই ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য কুমিরবেষ্টিত কারাগার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছেন ইসরাইলি এই মন্ত্রী।

হিব্রু গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা যাচাই করতে ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন, অবকাঠামোগত সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব নিরূপণের কাজ শুরু করেছে। যদিও সরকারিভাবে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম এই প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রস্তাবিত কারাগারের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে উত্তর ইসরাইলের অধিকৃত গোলান মালভূমির হামাত গাদের এলাকাকে বিবেচনা করা হচ্ছে। এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় কুমির খামারের জন্য পরিচিত। সেখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি কুমির রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ কুমির সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই বিদ্যমান অবকাঠামো এবং কুমির পালনের অভিজ্ঞতাকে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ১ জানুয়ারি ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষের উপ-কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল হামাত গাদের কুমির খামার পরিদর্শন করেন। সফরকালে তারা কুমিরের খাদ্য ব্যবস্থাপনা, প্রজনন, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শীতকালীন আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কুমির ব্যবহারের বাস্তবতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।

হামাত গাদের কুমির খামারের প্রধান নির্বাহী ইয়োসি মুসানেজাদ গণমাধ্যমকে জানান, প্রতিনিধি দলের সফরটি ছিল মূলত শিক্ষামূলক। তিনি বলেন, কুমির পালন অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল একটি কাজ। এটি কোনো সাধারণ গৃহপালিত প্রাণী নয়। সঠিক পানির পরিবেশ, নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ, বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধান এবং কঠোর নিরাপত্তা ছাড়া কুমির পালন সম্ভব নয়। তার এই মন্তব্য পরিকল্পনাটির বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্নও সামনে এনেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি ইসরাইলের পরিবেশ সুরক্ষামন্ত্রী ইদিত সিলমান নীল নদের কুমিরকে ‘তত্ত্বাবধানে থাকা বন্য প্রাণী’ হিসেবে পুনঃশ্রেণিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, এই প্রশাসনিক পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে কারাগার এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে কুমির রাখার আইনি পথ আরও সহজ হতে পারে। যদিও সরকারিভাবে এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি কারাগার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।

জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভির দাবি করেছেন, কুমির ব্যবহার করলে কারাগারের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং পালানোর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ-নিরাপত্তা কারাগারের অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণের তুলনায় এটি দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়-সাশ্রয়ী হতে পারে। তিনি আরও বলেন, একটি ছোট কুমিরের দাম প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার এবং বড় কুমিরের দাম প্রায় ২০ হাজার ডলার। প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দিতে তিনি প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেছেন।

তবে এই প্রস্তাব প্রকাশের পরপরই মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ইসরাইলভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা বিতসেলেম-এর চেয়ারম্যান অরলি নয় এই পরিকল্পনাকে ‘বর্তমান নীতির আরেকটি ভয়াবহ ও বিকৃত উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, বন্দিদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, মানবিক মূল্যবোধ এবং আইনের শাসনের নীতির সঙ্গে এমন প্রস্তাব সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি অভিযোগ করেন, ন্যায়বিচারের পথ অনুসরণ না করে অমানবিক পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাই এই প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলে ফিলিস্তিনি বন্দিদের নিয়ে নীতি ও কারা ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। বন্দিদের আটক, বিচারপ্রক্রিয়া, কারাগারের পরিবেশ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন অতীতে একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নতুন এই প্রস্তাব সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রের কারা ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং বন্দিদের প্রতি ন্যূনতম মানবিক আচরণের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। এ কারণে কুমিরবেষ্টিত কারাগারের ধারণা বাস্তবায়নের আগে আইনি, নৈতিক এবং মানবিক দিকগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ইসরাইলি সরকারের পক্ষ থেকে এখনও এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্যতা যাচাই এবং কারিগরি মূল্যায়নের কাজ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য কুমিরবেষ্টিত কারাগার নির্মাণের এই প্রস্তাব নিরাপত্তা নাকি মানবাধিকারের প্রশ্ন—এ নিয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবে রূপ পায় কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এরই মধ্যে বিষয়টি ইসরাইলের কারা নীতি, ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে বৈশ্বিক আলোচনা শুরু করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত