প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা ও সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনায় চাপে পড়েছে বিশ্ব স্বর্ণবাজার। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, চলতি সপ্তাহে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতনের মুখে পড়তে পারে স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজার।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম সামান্য বেড়ে ৩ হাজার ৯৮৮ দশমিক ২০ ডলারে লেনদেন হলেও দিনের শুরুতে এটি ১ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। একই সময় আগস্টে সরবরাহযোগ্য যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ৯৯২ ডলারে স্থির ছিল। তবে সপ্তাহজুড়ে বাজারের সামগ্রিক চিত্র ছিল নিম্নমুখী। এখন পর্যন্ত চলতি সপ্তাহে স্বর্ণের দাম প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে, যা গত ১ জুনের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বর্ণ সাধারণত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে। সুদের হার বৃদ্ধি পেলে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফা দেয় এমন সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
বিশ্ববাজারে এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা। সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় এক মাস আগে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম চলতি সপ্তাহেই প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। সেখানে কোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল সীমিত করার সম্ভাবনাও বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতির তথ্য কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সেই ইতিবাচক প্রভাবকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। তার মতে, বাজারে এখন মূল্যস্ফীতি ও বন্ডের মুনাফা বৃদ্ধির আশঙ্কাই স্বর্ণের দামকে চাপের মধ্যে রাখছে। ফলে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও স্বর্ণের বাজার প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের কর্মকর্তারাও সাম্প্রতিক সময়ে সুদের হার নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ডালাস ফেডারেল রিজার্ভের প্রেসিডেন্ট লোরি লোগান প্রকাশ্যে সুদের হার বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছেন। একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছেন ফেডের ভাইস চেয়ারম্যান ফিলিপ জেফারসনও। তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না নামলে কঠোর মুদ্রানীতি আরও দীর্ঘ সময় বহাল থাকতে পারে।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিনিয়োগকারীরা আগামী ডিসেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৭৩ শতাংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন। এই প্রত্যাশা বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে ডলারের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে, যা স্বর্ণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
শুধু স্বর্ণ নয়, মূল্যবান অন্যান্য ধাতুর বাজারেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে রুপার দাম কমে প্রতি আউন্স ৫৫ দশমিক ২২ ডলারে নেমেছে। একইভাবে প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও যথাক্রমে ১ হাজার ৬০৫ দশমিক ৬২ ডলার এবং ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ৮৬ ডলারে নেমে এসেছে। সপ্তাহ শেষে এই তিনটি ধাতুই মূল্যহ্রাসের পথে রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। একদিকে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে বাজারকে প্রভাবিত করছে। ফলে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদও এবার প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছে না।
বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারও আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামার দিকে নিবিড় নজর রাখছে। যদিও দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারণে স্থানীয় চাহিদা, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং কর কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবুও আন্তর্জাতিক বাজারের বড় পরিবর্তনের প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশীয় বাজারেও প্রতিফলিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয় অথবা জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। আবার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যদি সুদের হার আরও বাড়ায়, তবে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।